ঢাকা, বুধবার, ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ৩ মাঘ ১৪২৫

পুরুষালি টাক নিয়ে ভাবনা

২০১৪ নভেম্বর ০৮ ২২:১২:০৪
পুরুষালি টাক নিয়ে ভাবনা

এ সমস্যাটি অনেককেই ভাবাক্রান্ত করছে। এতে হার্ট এ্যাটাকের মতো যন্ত্রণা বা উচ্চ রক্তচাপের মতো সুগভীর জটিলতা না থাকলেও অনেকেই আয়নায় নিজের কমতে থাকা চুলের মাথার দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠেন। তাদের ভাবগতিক দেখে মনে হতে পারে যে, তারা প্রস্টেট ক্যান্সারের মতো কোনো জটিল রোগের সংবাদ পেলেন আয়নায় তাকিয়ে। তাদের অধিকাংশই সেলিব্রেটি নয়, সাধারণ মানুষ। সেলিব্রেটিদের এমন সমস্যায় বিস্তর ভুগতে দেখা যাচ্ছে। যেমন, হলিউডের অভিনেতা ব্রুস উইলিস, নিকোলাস কেজ, বেন কিংসলে, যুক্তরাষ্ট্রের তুমুল জনপ্রিয় বাস্কেটবল তারকা মাইকেল জর্দান ইত্যাদি। তারাও কী তাদের দ্রুত পতনশীল চুল নিয়ে বিব্রত? কেউ কেউ আবার ৬০ বা ৭০ বছর বয়সেও মাথাভর্তি চুল নিয়ে দিব্যি জীবনযাপন করছেন। তবে অন্যদের ক্ষেত্রে কেন হয় দশক পেরুতে বা না পেরুতেই মাথা ভাড়ের মাঠ হতে শুরু করে? আমরা আজ এ সব নিয়েই আলোচনা করছি। এতে আপনার চুল পড়া থমকে না গেলেও আপনি এটি হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য কতটা শ্রম বা অর্থ ব্যয় করবেন সে সম্পর্কে ধারণা পেতে পারবেন।

চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি

চুল সোজা বা কুঁকড়া যাই হোক না কেন, এর বৃদ্ধি একটি নির্দিষ্ট নিয়মে হয়। এ নিয়মে ৩টি পর্যায় আছে (১) বৃদ্ধিকাল (এনাজেন) পর্যায়, (২) স্থিতিকাল (ক্যাটাজেন) ও (৩) বিশ্রামকাল। বৃদ্ধিকাল সবচেয়ে বেশি সময় ধরে চলে। আর এটিই স্থির করে চুলটি কতটা লম্বা বা ছোট হবে। এ জন্য চোখের ভুরুর লোমগুলো ছোট হয় যাদের বৃদ্ধিকাল ১৩ মাসের মতো। মাথার চুলের বৃদ্ধি ৫-৮ বছর। সে জন্য মাথার চুল এতটা লম্বা হতে পারে। বৃদ্ধিকাল শেষে প্রতিটি চুল একটি স্থিতিকালে প্রবেশ করে। এ সময় কিছু কিছু চুল মারাও যেতে পারে। এর পর একটি কর্মহীন, বিশ্রামকাল শুরু হয়। বিশ্রামকাল শেষে কিছু চুল পড়ে যায়। তার ফলিকল থেকে নতুন চুল গজায়। মানুষের ক্ষেত্রে প্রতিটি চুলের আলাদা আলাদা জীবনচক্র থাকে। সে জন্য মানুষের দেহে মৌসুমি চুল পড়া দেখা যায় না। কিন্তু অন্য অনেক প্রাণীর দেহেই অধিকাংশ চুল একই সময়ে জীবনচক্র শুরু করে এবং একই সময় শেষ করে। সে জন্য তাদের ক্ষেত্রে মৌসুমি চুল পতন দেখা যায়।

জন্মের সময় একজন মানবশিশুর দেহে প্রায় ৫ মিলিয়ন চুলের ফলিকল থাকে (প্রতিটি ফলিকল থেকে এক সময় ১টি করে চুল গজায়)। এর মধ্যে মাথাতেই থাকে প্রায় ১ লাখ ফলিকল। সারা জীবন ধরেই স্থির থাকে। কিন্তু প্রতিটি ফলিকলের কার্যকারিতা ও চুল গঠন করার ক্ষমতা বিভিন্ন জনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম হয়। একজন মানুষের মাথার চুলের খুব ভাল এবং স্বাস্থ্যকর অবস্থায় প্রায় ৯০% ফলিকল বৃদ্ধিকালে থাকে; ১% এরও কম স্থিতিকালে থাকে এবং ৫%-১০% থাকে বিশ্রামকালে।

ভঙ্গুর ফলিকল

চুলের ফলিকলে দেহের অন্যান্য অংশের মতো জীবিত, কর্মক্ষম কোষ থাকে। তাই সব কোষ দেহের বাকি কোষগুলোর মতো ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে পারে, এদের বৃদ্ধি রহিত হতে পারে। এ সমস্যাটি যদি মৃদু আকারের হয় তবে ফলিকলটি আবার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসতে পারে এবং চুলের বৃদ্ধি চলতে থাকে। কিন্তু যদি আঘাতটি বড় ধরনের হয় তবে ধ্বংস প্রক্রিয়াটি স্থায়ী হয় এবং চুলের বৃদ্ধি বন্ধ থাকে। যে কোনো প্রবল চাপ শারীরিক বা মানসিক, চুলের ফলিকলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। চুলের বৃদ্ধি রহিত করে। সে জন্য দেখা যায়, কোনো ধরনের অসুস্থতা বা আঘাতের ২-৩ মাস পর অনেকের মাথার চুল পড়ে যায় অনেকাংশে। তবে এটি একটি সাময়িক সমস্যা। এক্ষেত্রে পরের ক’মাসে অধিকাংশ চুল গজায়। অনেক ওষুধও চুলের ফলিকলকে ধ্বংস করে। ক্যান্সার কেমোথেরাপির প্রায় প্রতিটি ওষুধই চুল পড়ার কারণ হয়। বিষাক্ত পদার্থ, রেডিয়েশন, থাইরয়েড গ্রন্থির অসুখ বা জীবাণু সংক্রমণেও চুল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে/পড়ে যেতে পারে। ত্বকের যে সব অসুখে আঁশ আঁশ হয়, সেগুলোতেও চুল উঠে যেতে পারে। তবে এসব সমস্যাই খুব কম দেখা যায়। অন্যদিকে আমরা গুরুত্ব না দিলেও সেবোরিয়া ও খুসকিতে চুল পড়ার ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি ঘটে।

স্বাভাবিক চুল পড়া

পুরুষদের পুরুষালি চুল পড়াকে অনেকেই অস্বাভাবিক ভাবলেও এটি আসলে স্বাভাবিক। আর বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চুল কমতে থাকা একটি অবধারিত পরিবর্তন। তবে কতটা বা কী হারে চুল পড়ছে সেটি বিবেচ্য। বয়স বাড়তে থাকার সঙ্গে চুল কমতে থাকাটা আপনার মনের চাপ বৃদ্ধি করলেও, এটিকে একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত অসুখ বলার কোনো উপায় নেই। মহিলাদেরও চুল ক্রমেই কমতে থাকে। আর পুরুষালি টাক বা এন্ড্রোজেনিক এলোপেসিয়া স্বাভাবিক চুল পড়ারই একটু বেশি দ্রুত রূপ। পুরুষালি টাকের দুটো প্রধান উপাদান হলো— জেনেটিক প্রভাব ও পুরুষ যৌন হরমোন, টেস্টোস্টেরোন। পুরুষের চুল পড়ার জেনেটিক প্রভাব বেশ জটিল। অনেকগুলো পারস্পরিক ঘটনা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে এটা নিশ্চিত যে, কিছু বিশেষ পুরুষের ক্ষেত্রে এ সব জিনের কার্যক্রম একটু বেশি প্রবল। মানুষ এ জিনটি তার বাবা বা মা কারো কাছ থেকেই পেতে পারে। শুধু তাই নয়, ছেলে বা মেয়ে উভয়েই এ জিনটি বংশানুক্রমে পেতে পারে। তবে পুরুষরা এর প্রভাবে বেশি টাকাক্রান্ত হয়। কেননা, তাদের দেহে বেশি মাত্রায় টেস্টোস্টেরোন থাকে। টেস্টোস্টেরোন পুরুষটিকে পুরুষ করে তোলার জন্য অপরিহার্য। টেস্টোস্টেরোন পুরুষের মাংসপেশীকে বলিষ্ঠ, সবল করে, স্বর গভীর করে হাড় পুরু ও শক্ত করে। টেস্টোস্টেরোন পুরুষের প্রজনন গ্রন্থিগুলো ও প্রজনন কার্যক্রমের জন্যও অপরিহার্য। টেস্টোস্টেরোনের অভাবে পুরুষ পুরোপুরি হতে পারে বা পুরুষ তার পুরুষালি বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারে না। বয়োসন্ধিকালে টেস্টোস্টেরোন নিঃসরণ বেড়ে যায় বিভিন্ন জৈবনিক ক্রিয়াকলাপের মাত্রা ও প্রাবল্য ঠিকমত বজায় রাখতে। উপরের স্বাভাবিক ও প্রত্যক্ষ কাজকর্মের বাইরেও এ হরমোনটি পরোক্ষভাবে প্রস্টেটগ্রন্থি ও চুলের ফলিকলের ওপর কাজ করে। টেস্টোস্টেরোন পরোক্ষভাবে দাঁতের ফলিকল ধনাত্মক প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু পরোক্ষভাবেই অন্যান্য স্থানের চুলের ফলিকল বিশেষ করে মাথার চুলের ফলিকলে ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া করে ১৭-৪০ বছর বয়সে। ৫০ বছর বয়সের মধ্যে প্রায় অর্ধেক পুরুষ তার মাথায় পুরুষালি টাক নিয়ে জীবনযাপন করে থাকতে শুরু করে। পুরুষালি টাকের বৈশিষ্ট্য হল— মাথার ওপরের দিকে চুল ঠিক রেখে দু’পাশে চুলের সংখ্যা ক্রমেই কমতে থাকা এবং তা দিন দিন বাড়তে থাকা। এখানে চুল পড়ার হার সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। কারো কারো ক্ষেত্রে ৫ বছরের মধ্যেই টাক পড়ে যায়। আবার কারো ক্ষেত্রে ১৫-২৫ বছর লেগে যায়। সাধারণত পুরুষালি টাকের বেলায় প্রতিবছর ৫% চুল হারাতে থাকে। পুরুষদের টাকের বিচরণভূমিতে চুলের ফলিকল কিন্তু আস্তই থাকে। এখানে আসলে প্রতিটি বৃদ্ধিকাল ক্ষণস্থায়ী হতে থাকে এবং চুলও চিকন হতে থাকে। এক্ষেত্রে স্থিতিকাল দীর্ঘস্থায়ী হয় ও চুল ত্বকের সঙ্গে কম দৃঢ়ভাবে আটকে থাকতে পারে। ফলে চুল পড়ার হার বাড়তে থাকে। সেটা প্রত্যক্ষ করা যায় মাথা ধোয়ার বা চুল আঁচড়ানোর সময়।

ক্ষতিকর দিক

পুরুষালি টাককে কোনোভাবেই অসুখ বলা যাবে না। এর কোনো ক্ষতিকর দিক নেই, শুধু দেখতে বয়স্ক লাগা বা সৌন্দর্যহানি হয়েছে বলে বিবেচনা করা ছাড়া। আর বিরূপ প্রভাব শুধুই মনস্তাত্ত্বিক— দৈহিক কোনো সমস্যা হয় না। তবে টাক হৃদরোগের ঝুঁকির একটি দুর্বল চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, টাকওয়ালাদের হৃদরোগ হওয়ার হার বেশি। বরং যাদের মাথাভর্তি চুল তাদের কম। আর যে সব মানুষের উচ্চ রক্তচাপ বা যাদের রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি তাদের জন্য আরও বেশি।

চিকিৎসা

অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা পুরুষালি টাকের পক্ষে মত দেন না। এ সব ক্ষেত্রে চুল প্রতিস্থাপনই সবচেয়ে ভাল ব্যবস্থা। আমাদের দেশেও আজকাল দেদার চুল প্রতিস্থাপন চলছে। যাদের সৌন্দর্যহানির হাত থেকে রক্ষা পেতে উৎগ্রীব তারা তা করতে পারেন। এটিও বেশ কয়েক রকম। যারা এ কাজ করেন, তারা টাকের বিস্তার অবস্থান ইত্যাদি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সঠিক পন্থাটি বেছে নেন। তবে এখনো এটি কিছুটা ব্যয়বহুল পদ্ধতি।

তবে যারা একান্তই নাছোড়বান্দা তারা নিম্নলিখিত ওষুধের কোনোটি সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারেন-

মিনোক্সিডিল এটি বাজারে ১%, ২% ও ৫% মাত্রায় পাওয়া যায়। এটি চুলের ফলিকলের বৃদ্ধিকাল বাড়ায়। তবে এটি শুধু এখন সক্রিয় আছে এমন ফলিকলের ওপর কাজ করে। আর যতদিন এটি ব্যবহার করা হয়। ততদিনই শুধু সুফল পাওয়া যায়।

ফিনাস্টেরাইড- মুখের খাবার ওষুধ এটি। এটি টেস্টোস্টেরোনের কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করে। ছোট থেকে মাঝারি আকারের পুরুষালি টাকের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এটি দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যেহ খেতে হয়। এটির মোট চিকিৎসা ব্যয় মিনোক্সিডিলের চেয়ে বেশি পড়লেও এটি বেশ সহনীয়। তবে সন্তান ধারণক্ষম মহিলাদের এটি ব্যবহার না করাই ভাল।

উপসংহার

স্বাভাবিক চুল পড়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসার কথা ভাবার কোনো কারণ নেই। টাককে মেনে নেওয়াই সবচেয়ে ভাল। আয়নায় নিজের টাকমণ্ডিত চেহারা দেখে টাককে সুশোভিত করার কথাই ভাবুন। যা গেছে তা গেছে, যা আছে তাই ভাল।

লেখক :
ডা. শাহজাদা সেলিম
এমবিবিএস, এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম)
এমএসিই (ইউএসএ)
হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, ঢাকা
এবং
কমফোর্ট ডক্টরস্ চেম্বার
১৬৫-১৬৬, গ্রীনরোড, ঢাকা।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সুস্বাস্থ্য প্রতিদিন এর সর্বশেষ খবর

সুস্বাস্থ্য প্রতিদিন - এর সব খবর



রে


রে