ঢাকা, বুধবার, ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ৩ মাঘ ১৪২৫
রানা মুহম্মদ মাসুদ

দ্য রিপোর্ট

চন্দ্রিমা উদ্যানে ফিটনেস ক্লাব

ব্যায়াম করুন, সুস্থ থাকুন (ভিডিওসহ)

২০১৪ নভেম্বর ১৫ ১৬:১৫:৩২

ভোর সাড়ে ৬টা, শুক্রবার। রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানে ‘চান্দ্রিমা ফিটনেস ক্লাব চত্বরে’ সবাই সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে গেছেন। আধুনিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত মানুষগুলোর মধ্যে যেন শরীরচর্চায় জরা-ব্যাধি উতরানো সুস্বাস্থ্যের চাঞ্চল্য। নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ, তরুণ, শিশু এখানে সবাই আছেন। পারিবারিক হৃদ্যতাও নিবিড়।

গ্যালারির মতো কংক্রিটের খাঁজ ঘেরা চত্বরের দক্ষিণ দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছেন সবাই। একেবারে সামনে দাঁড়িয়েছেন ওস্তাদ। তার নাম আমির হোসেন। তিনিই চান্দ্রিমা ফিটনেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। পশ্চিম পাশের উঁচু বেদিতে বসানো হয়েছে স্পিকার।

ব্যায়াম শুরুর আগে অনেককে পাশের মানুষের সঙ্গে কুশলবিনিময় করতে দেখা যায়। পরম আপন মানুষের মতো খুনসুটিতেও মেতে ওঠেন কেউ কেউ। কৌতুক করেন একে অপরের সঙ্গে।

ওস্তাদ আমির হোসেন শুরুতেই বলেন, ‘ব্যায়াম করছি, সুস্থ হচ্ছি, ভালো হচ্ছি, মনে এই বিশ্বাস রাখতে হবে।’ এরপর এক এক করে বিভিন্ন কসরতের মাধ্যমে হাত ও পায়ের বিভিন্ন জয়েন্ট, ঘাড়, কোমর, পেট, বুক চোখ, নাক, কান, ফুসফুস, হৃৎপিণ্ডসহ শরীরের ভেতর ও বাইরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যায়াম করান তিনি। পদে পদে ঝরে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা- ‘হে সৃষ্টিকর্তা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আপনি আমাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভালো রাখুন।’

মাঝে মাঝেই বয়ে যায় প্রাণখোলা অট্টহাসির হিল্লোল। চলে খাবারের টিপস। সমস্বরে চলে এমন আবৃত্তিও—‘শরীর যদি ভালো চাও, সকাল বেলা মাঠে যাও/শরীর যদি খারাপ চাও বিছানাতে শুয়ে রও’। ওস্তাদ বলেন, সবকিছু খাবেন আঙ্গুলের মাথা দিয়ে। আমরা বলি—‘অধিক খেতে করে আশ/তার নামই সর্বনাশ। খাবার পরে আবার খায়/মরণ তার পাশে রয়।’

সকাল ৭টা বাজতেই চত্বর উপচেপড়ে মানুষে। চত্বর ছাড়িয়ে মানুষ চলে গেছে আরও দূরে। সাড়ে ৭টার দিকে শেষ হয় ব্যায়াম।

সমাজের নিম্ন শ্রেণী থেকে একেবারে উচ্চ শ্রেণীর লোকজন চন্দ্রিমা ফিটনেস ক্লাবের সদস্য। শুধু প্রতিদিনের অভ্যস্ততাই নয়, এখানে আসা বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ তীব্র টানে মমতায় জড়িয়ে গেছেন। তারা অকপটেই জানিয়েছেন তাদের সুস্থতা ও অদৃশ্য বন্ধন ও সেই অনুভূতির কথা।

মাহবুব আলম (৬৩) আসেন মোহাম্মদপুর বাবর রোড থেকে। একসময় এনজিওতে চাকরি করতেন। তিনি ১০ বছর ধরে ব্যায়াম করেন। মাহবুব আলম বলেন, আমার উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, নিয়মিত ব্যায়ামের কারণে এটি আমার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। আমার স্ত্রীও এখানে আসেন।

‘একদিন এখানে না এলে ভালো লাগে না। প্রথমে এসেই আমরা কুশলবিনিময় করে নিই। বাসায় তো একা থাকি, এখানে পারিবারিক একটা পরিবেশ পাওয়া যায়’—বলেন মাহবুব আলম।

মুক্তিযোদ্ধা ও কবি আব্দুল খালেক আলো (৭২) বলেন, নিয়মিত ব্যায়াম করার পর মনে হয় আমার বয়স ৭২ নয় ২৭ বছর। আমি ’৭১ সালের যুদ্ধ করা সেই তারুণ্য যেন ফিরে পেয়েছি।

ডা. শাহজাহান আহমেদ চৌধুরী (৬০) ২০০৬ সাল থেকে এখানে আসছেন বলে জানান। তিনি বলেন, গত আট বছর আমি বড় কোনো অসুখে পড়িনি। আগে সর্দি, কাশি লেগে থাকলেও এখন তাও নেই।

সপ্তাহে ৬ দিন এক ঘণ্টা করে ব্যায়াম করলে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও জানান ডা. শাহজাহান।

শেখের টেক ৮ নম্বর রোড থেকে নিয়মিত আসেন মো. আব্দুর রশিদ (৬২)। তিনি বলেন, ছয় বছর ধরে আমি এখানে ব্যায়াম করি। আমার হার্টের অসুখ, ডায়াবেটিস

ডা. মো. হোসাইন আহমদও (৬৩) ব্যায়ামের মাধ্যমে সুস্থ আছেন বলে জানান। তিনি এখানে ১০ বছর ধরে শরীরচর্চা করেন।

সুপ্রীমকোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট গিয়াসউদ্দিন আহমেদ (৭৯) বলেন, আমার বাসা পূর্ব রাজাবাজারে। আমি ক্লাবের আজীবন সদস্য। চার বছর ধরে এখানে আসি। আগে দূরে কোথাও গেলে ভয় লাগত, সঙ্গে কাউকে নিতে হতো। এখন আর সেই ভয় নেই, সঙ্গেও কাউকে নিতে হয় না।সবকিছু একেবারে নিয়ন্ত্রণে।

তিনি বলেন, ব্যায়ামের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য নিয়ে এখানে চমৎকার চমৎকার তথ্য দেওয়া হয়। আমি এগুলো মানার চেষ্টা করি, এ জন্য আমি ভালো আছি। ‘এখানে না আসলে ভালো লাগে না। সকলের সাথে কেমন যেন একটা মায়ার বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে’ বলেন গিয়াসউদ্দিন।

নূর আফসানা নেলী এখানে নারীদের নেতৃত্ব দেন। মোহাম্মদপুর হাউজিং সোসাইটিতে তার বাসা। তিনি বলেন, ‘নিয়মিত ব্যায়াম করায় আমার কোনো রোগ নেই। আমরা এখানে একটি পরিবার গড়ে তুলেছি। একসাথে সবাই মিলে উৎসব, আনন্দ করি। সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করি।’

মরিয়ম আক্তারও (৪০) এসেছেন মোহাম্মদপুর থেকে। তিনি বলেন, আগে তো কত অসুখ ছিল। এখন আর কোনো ওষুধ খাই না। আট বছর ধরে এখানে ব্যায়াম করছেন বলেও জানান তিনি।

১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠা করা চন্দ্রিমা ফিটনেস ক্লাবের সদস্য এখন দুই হাজার দুই শত জন। সপ্তাহে সাত দিনই ব্যায়াম হয়। প্রতিদিন ব্যায়ামে ৫০০ থেকে ৮০০ জন উপস্থিত হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফরম পূরণ করে এখানে যে কেউ সদস্য হতে পারবেন। বছরে এক হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। আজীবন সদস্যদের চাঁদা বছরে পাঁচ হাজার টাকা। প্রতিদিনের ব্যায়ামে অংশ নিতে কোনো চাঁদা দিতে হবে না।

ছবি ও ভিডিও : জুবায়ের আহমেদ

(দ্য রিপোর্ট/আরএমএম/এইচএসএম/এনআই/নভেম্বর ১৪, ২০১৪)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সুস্বাস্থ্য প্রতিদিন এর সর্বশেষ খবর

সুস্বাস্থ্য প্রতিদিন - এর সব খবর



রে


রে