ঢাকা, বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৮ ফাল্গুন ১৪২৫

সুস্থ থাকতে আঁশযুক্ত খাবার খান

২০১৪ নভেম্বর ১৭ ১১:৫১:১৩
সুস্থ থাকতে আঁশযুক্ত খাবার খান

ডা. শাহজাদা সেলিম, দ্য রিপোর্ট : খাদ্যের উপাদান ছয়টি, যথা শর্করা, আমিষ, স্নেহ, ভিটামিন, খনিজ লবণ আর পানি। এটা আমাদের ছোটবেলার পড়াশোনা। তবে খাবারের আঁশ জাতীয় অংশ বা আঁশ জাতীয় খাবারগুলো কিন্তু এদের কোনটির মধ্যেই অন্তর্ভুক্তি পাচ্ছে না। কিন্তু এ খাবারের গুরুত্বও কিন্তু খাটো করে দেখার উপায় নেই। তাই সবকিছু বিবেচনা করে আঁশজাতীয় খাবারকে এখন আরও একটি খাদ্য উপাদান হিসেবে ধরা হচ্ছে। এটাকেই বলা হয় ডায়েটারি ফাইবার বা আঁশজাতীয় খাবার। সাধারণভাবে আঁশজাতীয় খাবারটুকু আমাদের পরিপাকতন্ত্রে হজম হয় না। এর কারণ হলো এদের হজম করার জন্য আমাদের পরিপাকতন্ত্রে কোনো পাকে রস বা এনজাইম নেই। আর হজম না হওয়ার জন্য এটা থেকে ধারণা হতে পারে, এগুলো কি প্রয়োজনহীন? কিন্তু এটা ঠিক নয়। খাবারের আঁশ জাতীয় অংশটুকু হলো হজম না হওয়া শর্করার অংশ। এগুলো আমাদের দেহের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালরি বা শক্তি সরবরাহ না করলেও তা অনেক দিক থেকে যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করবে, যা আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য বড় শর্ত। খাদ্যের আঁশ অংশটুকু হজম না হওয়ার কারণে এগুলো পরিপাকতন্ত্রের বেশ কিছু জলীয় অংশ শোষণ করে ধরে রাখে এবং এই জলীয় অংশসহ এগুলো মলের সাথে বের হয়ে আসে। এতে মল নরম হয়। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ হয়। আরামদায়ক মল ত্যাগের জন্য মলদ্বারের বেশ কিছু ঝামেলামুক্ত রোগ প্রতিরোধ হয়। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো, পাইলস বা অর্শ, ভগন্দর বা এলা ফিসার, পায়ুপথের ফোঁড়া বা পেরি এনাল এ্যাবসেস ইত্যাদি। যারা বেশি পরিমাণে আঁশযুক্ত খাবার খেয়ে থাকেন তাদের পরিপাকতন্ত্রের ক্যান্সার, এ্যাপেনডিসাইটিস, ডাইভারটি-কুলাইটিস হওয়ার ঝুঁকি কমে। নিয়মিত কোষ্ঠকাঠিণ্যের জন্য হারনিয়া হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু আঁশযুক্ত খাবারের তা অনেকাংশে প্রতিরোধ সম্ভব।

খাবারের আঁশ পরিপাকনালী থেকে আমাদের খাবারের কোলেস্টরল শোষণে বাঁধা দেয়, যাতে রক্তে কোলেস্টরলসহ চর্বির মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে বিভিন্ন হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তনালীর রোগ বা এ্যাথেরোসক্লেরোসিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়। খাদ্য গ্রহণের পর আমাদের রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা যাতে হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে সে ব্যাপারে আঁশজাতীয় অংশ গুরুত্ব বহন করে। এতে ডায়াবেটিস রোগের ঝুঁকি কমে। আবার যেহেতু ডায়াবেটিস রোগীদের অনেক সময় রক্তে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে, সেক্ষেত্রে আঁশজাতীয় খাবার সেটির নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। দেখা গেছে যারা বেশি আঁশজাতীয় খাবার খেয়ে থাকে তাদের পিত্তথলির রোগ ও লিভারের রোগও কম হয়।

অনেক দিন ধরে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগলে এর প্রভাব মনের ওপর পড়তে পারে। এতে দিনের কাজকর্মের রুটিন ব্যাহত হয়। কাজে কর্মে মনোসংযোগ সুষ্ঠু হয় না, অশান্তি, উদ্বিগ্নতা, কোন কঠিন রোগ হয়েছে এমন ধারণা ঘাড়ে চেপে বসে।

উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে প্রাপ্ত মোটামুটি সব খাবারের মধ্যেই কমবেশি আঁশ জাতীয় অংশ আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেমি আছে শাকসবজিতে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমরা দিনকে দিন খাবার টেবিলে সবজির অংশটাকে অনেক নিচে নামিয়ে দিয়েছি, যা আমাদের ভুল খাদ্যাভাসের জন্য বা অসচেতন ও উদাসীন পুষ্টি জ্ঞানের জন্য। হয়তবা এ কারণের জন্য উপরোক্ত রোগের ঘটনা হরদম বেড়েই চলেছে। এটা কি খুশির সংবাদ নয় যে, খাবারের এই অভ্যাসগত পরিবর্তনের দ্বারা অনেক জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে আমরা নিজেদেরকে অনেক দূরে রাখতে পারি? তাই জরুরি হলো খাদ্যে আঁশ জাতীয় খাবারের পরিমাণ ঠিকমতো থাকা।

আঁশ সমৃদ্ধ খাবার

* শাক : কচুশাক, মিষ্টি আলুশাক, কলমিশাক, পুদিনা পাতা, পুঁইশাক, মূলাশাক, ডাটাশাক, লাউয়ের ও মিষ্টি কুমড়ার আগা-ডোগা শাকে প্রচুর আঁশ অংশ রয়েছে।

* সবজি : অপেক্ষাকৃত বেশি আঁশযুক্ত সবজির মধ্যে রয়েছে সজনে, কলার মোচা, ঢেঁড়স, ডাটা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ওলকপি, শিম, পটল, কচু, বেগুন, বরবটি, মটরশুঁটি।

* ফল : আঁশ জাতীয় ফলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আঁশ অংশ থাকে বেল, পেয়ারা, কদবেল, আমড়া, আতাফল, নারকেল, কালোজামের মধ্যে। এছাড়াও গাব, কামরাঙ্গা, পাকা টমেটো, পাকা আম, পাকা কাঁঠাল, আপেল ও আমলকির মধ্যে মাঝারি পরিমাণে আঁশ থাকে।

* ডাল : মটর, মুগ, ছোলা ও খেসারি ডালের মধ্যে সবচেয়ে বেমি আঁশ পাওয়া যায়।

* অন্যান্য : যব, ভুট্টা, আটা, তিল, কাঁচামরিচ ও সরিষাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আঁশ অংশ বিদ্যমান।

এমন নয় যে খাবারগুলো দামি, সহজলভ্য নয় বা স্বাদে ভালো নয় তা কিন্তু না। শুধু চাই ইচ্ছা, তাতেই আপনার গতানুগতিক আংশিক ভুল খাদ্যাভাসকে সম্পূর্ণ শুদ্ধ খাদ্যাভাসে পরিণত করা সম্ভব। এতেই আপনি থাকবেন সুস্থ। তখন অনেক রোগ হবে গুডবাই। মনে হবে বেঁচে থাকা মানেই সুস্থতা। তাই আঁশযুক্ত খাবার রাখুন প্রত্যেক দিনের খাবারের তালিকায়, পরিমাণে ও রান্নার ভিন্নতায়।

লেখক

ডা. শাহজাদা সেলিম
এমবিবিএস, এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম), এমএসিই (ইউএসএ)
হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
এবং
কমফোর্ট ডক্টরস্ চেম্বার
১৬৫-১৬৬, গ্রীন রোড, ঢাকা।



পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সুস্বাস্থ্য প্রতিদিন এর সর্বশেষ খবর

সুস্বাস্থ্য প্রতিদিন - এর সব খবর



রে


রে