ঢাকা, বুধবার, ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ৩ মাঘ ১৪২৫

 

এন্ডোমেট্রিওসিসের সমস্যা থাকলেও মা হতে পারেন

ডা. শাহজাদা সেলিম

২০১৫ জানুয়ারি ০৬ ২২:৩৮:৩০
এন্ডোমেট্রিওসিসের সমস্যা থাকলেও মা হতে পারেন
ডা. শাহজাদা সেলিম

তলপেটের ব্যথায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত পিরিয়ডের সময় একদিকে হেভি মেনস্ট্রুয়াল ব্লিডিং অন্যদিকে অসহ্য ব্যথায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে হয়। পরীক্ষা করে দেখা যায় এন্ডোমেট্রিওসিস নামক সমস্যা এই ভয়ানক ব্যথার অন্যতম কারণ। শুধু তাই নয় এন্ডোমেট্রিওসিস থাকলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বন্ধ্যত্ব অনিবার্য। এক্ষেত্রে সন্তান ধারণ করতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে আইভিএফ এর সাহায্য নিতে হয়।

এন্ডোমেট্রিওসিস কী

মেয়েদের ইউটেরাসের ভেতরে একটি পাতলা টিস্যুর লাইনিং থাকে। এরই ডাক্তারি নাম এন্ডোমেট্রিয়াম। পিউবার্টির সময় থেকে মেনোপজ পর্যন্ত প্রতিমাসেই পিরিয়ডের পরে এটি তৈরী হয় ও ধীরে ধীরে পরিণতি পায়। সেই ঋতুচক্রে মহিলা গর্ভবতী না হলে ২৮-৩০ দিন পর জরায়ু থেকে খসে যায় ও পরবর্তী মাসিক ঋতুচক্র শুরু হয়। এন্ডোমেট্রিয়াম লাইনিং ইউটেরাসের বাইরের দিকে, ওভারিতে, ফ্যালোপিয়ান টিউবে, এমনকি রেক্টামের মতো অন্যান্য অঙ্গেও তৈরী হতে পারে। পিরিয়ডের সময়ে হরমোনের প্রভাবে এই সব অস্বাভাবিক এন্ডোমেট্রিয়াম থেকেও ব্লিডিং হয়। এই অংশের টিসুগুলিও আলগা হয়ে জড়িয়ে যায়। ফলে অসহ্য ব্যথা আর হেভি ব্লিডিং শুরু হয়।

কী করে বুঝবেন

এন্ডোমেট্রিওসিসের অন্যতম উপসর্গ ব্যথা আর ব্যথা। তলপেট, পিঠ, কোমর অর্থাৎ পেলভিক অঞ্চলে প্রচণ্ড ব্যথা। পিরিয়ড শুরুর আগে ও পিরিয়ডের সময়ে এই ব্যথা শুরু হয়, পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত ব্লিডিং ছাড়াও মাসের অন্য সময়েও একই রকম ব্যথা, ক্লান্তি, খিটখিটে ভাব, বিরক্তি, সন্তানহীনতা প্রভৃতি দেখা যায়। এন্ডোমেট্রিওসিসে সব সময়ে ব্যথা তো হয়ই। এ ছাড়াও মলত্যাগ, প্রস্রাবের সময় এমনকি ইন্টারকোর্সের সময়েও ব্যথা হতে পারে। একমাত্র ল্যাপারোস্কোপির সাহায্যে বিশেষ ধরনের ক্যামেরা পেটে প্রবেশ করিয়ে এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্তকরণ সম্ভব। এন্ডোমেট্রিওসিস অবশ্যই বন্ধ্যত্বের একটি বড় কারণ। তবে আজকের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থায় এন্ডোমেট্রিওসিসকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চলে সন্তানের জন্ম দেওয়া সম্ভব।

এন্ডোমেট্রিওসিস ও আইভিএফ

এন্ডোমেট্রিওসিস থাকলে স্বাভাবিক ভাবে সন্তানের জন্ম দেওয়া বেশ মুশকিল। বেশ কিছু ক্ষেত্রে আইভিএফ-এর সাহায্য নিতে হয়। এ প্রসঙ্গে চলে আসে ফলিকিউলোজেনেসিসের প্রসঙ্গ। আসলে এই অসুখে ওভারির সঙ্গে ফ্যালোপিয়ান টিউবের সামঞ্জস্য বিঘ্নিত হয়। অর্থাৎ ওভারি থেকে ডিম্বাণু নিঃসৃত হয়ে ফ্যালোপিয়ান টিউবে আসার প্রক্রিয়াটি ব্যহত হয়। তাই স্বাভাবিক ভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যায়। চিকিৎসা হিসেবে ওরাল কন্ট্রাপেটিভ পিল, GnRH ওই ইনজেকশন বা ইন্ট্রাইউটেরাইন ডিভাইস মিরেনা ব্যবহার করা হয়। এসবই গর্ভ-ধারণের পরিপন্থী। কেননা এই ধরনের চিকিৎসা ডিম্বাণু নিঃসরণ করতে বাধা দেয়। এক্ষেত্রে ট্র্যান্স ভ্যাজাইনাল আলট্রাসনোগ্রাফি এবং ল্যাপারোস্কোপির সাহায্যে ওভারি দুটিকে খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে তারপরই বন্ধত্বের কী ধরনের চিকিৎসা করা হয় সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রোগীর বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে আইভিএফ-এর সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সন্তানের জন্ম দিতেই পারেন। আর রোগীর বয়স ৩৫ বছরের কম, অল্প এন্ডোমেট্রিওসিস, দুটি ফ্যালোপিয়ান টিউব মোটামুটি স্বাভাবিক- এই অবস্থায় IUI করেও ভাল ফল পাওয়া সম্ভব। অনেক সময় ওভারির কর্মক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সিরাম AMH পরীক্ষা করতে হতে পারে।

ইনফার্টিলিটি স্পেশালিস্টের পরামর্শ নিতেই হবে। এন্ডোমেট্রিওসিস হলে অবশ্যই শুরু থেকে সঠিক ট্রিটমেন্ট করানো উচিত। কেননা অন্যান্য অসুখের মতোই এই রোগটির শুরুতে চিকিৎসা করলে একদিকে যেমন নানান জটিলতা এড়ানো যায়, অন্যদিকে তেমনই কষ্টও কম হয়। ফেলে রাখলেই বিপদ। যেহেতু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ রোগের সূত্রপাত চাইল্ডবিয়ারিং এজ-এ, তাই প্রথম থেকেই সন্তান ধারণের কথাটা মাথায় রাখা উচিত। একজন বন্ধ্যত্ব বিশেষজ্ঞর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা করালে পরবর্তীকালে সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে অনেক জটিলতা এড়ানো যায়। পিরিয়ডের সমস্যা হলে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে রোগ নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসা শুরু করানো আবশ্যক।

সম্পূর্ণ সারে না

এন্ডোমেট্রিওসিস এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ রূপে সারানো যায়নি। ডায়াবেটিস, সোরিয়াসিস বা হাইপারটেনশনের মতো এন্ডোমেট্রিওসিসও নিয়ন্ত্রণে থাকে। ইনফার্টিলিটির চিকিৎসায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এন্ডোমেট্রিওসিস সার্জারির প্রয়োজন হয়। আবার যন্ত্রণা কমাতে বিভিন্ন ওষুধ কার্যকরী, সঠিকভাবে বলতে গেলে বিশেষজ্ঞ সার্জনের কাছে নিপুণ সার্জারি, বিভিন্ন ওষুধ ও হরমোনের সাহায্যে একযোগে চিকিৎসায় এন্ডোমেট্রিওসিস সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণে থাকে। যদি অসহ্য ব্যথায় জীবনযাপন দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে এবং ল্যাপারোস্কোপিক পরীক্ষায় শনাক্ত হয় যে এন্ডোমেট্রিওসিস এই কষ্টের কারণ, তবে প্রথমে বিভিন্ন ওরাল কন্ট্রাপেটিভ পিল ও অন্যান্য ওষুধের সাহায্যে রোগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা উটিত। ওষুধে কাজ না হলে চিকিৎসকের সঙ্গে সব রকমের উপসর্গ ও কষ্ট নিয়ে আলোচনা করে সার্জারির সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজনে মনোবিদ বা সাইকোলজিকাল কাউন্সেলরের সঠিক চিকিৎসা করিয়ে ভাল থাকুন।

ডা. শাহজাদা সেলিম
এমবিবিএস, এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম)
এমএসিই (ইউএসএ)
হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সুস্বাস্থ্য প্রতিদিন এর সর্বশেষ খবর

সুস্বাস্থ্য প্রতিদিন - এর সব খবর



রে


রে