ঢাকা, বুধবার, ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ৩ মাঘ ১৪২৫

পর্ব- ২

ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাবেন কীভাবে

২০১৫ ফেব্রুয়ারি ২৭ ১৭:৫৫:২২
ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাবেন কীভাবে

ডা. শাহজাদা সেলিম

(পূর্ব প্রকাশের পর) মনোচিকিৎসক সিগমান্ড ফ্রয়েড (১৮৫৬-১৯৩৯) বিলেতে হাজার হাজার মনোবিকৃত রোগীর জীবন ইতিহাস পর্যালোচনা করে ব্যক্তিত্বের বিকাশ সম্বন্ধে কতগুলো ধারণা তৈরি করে যে মতবাদ প্রবর্তন করেছেন সেটাই হলো মনোসমীক্ষণতত্ত্ব (Psychoanalytic theory)। ফ্রয়েডের তত্ত্বগুলো হলো-

ব্যক্তিত্বের গড়ন (Personality structure):

ফ্রয়েড মনে করেন, মানুষের ব্যক্তিত্ব তিনটি সত্তায় বিভক্ত এবং এগুলোর তিনি নাম দিয়েছেন আদিম সত্তা বা পশুত্ব (Id), বাস্তবতা বা আমিত্ব (Ego) ও মানবতা বা নৈতিকতা (Super-ego) এভাবে। তার মতে, এ তিন সত্তার মাধ্যমেই মানুষের ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এগুলো আগের অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে, তবুও নিম্নে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো-

পশুত্ব বা আদিম সত্তা (Id): এটা হলো সম্পূর্ণভাবে অবচেতন মনে এবং মানুষের জন্মগত জৈবিক সত্তা, সমস্ত আদিম কামনা ও বাসনার আধার। তাৎক্ষণিক সুখ ভোগ তার কাম্য (Immediate gratification) এবং কোনো প্রকার যুক্তি, বিচার, বুদ্ধি বা নৈতিকতার ধার সে ধারে না। সে সুখভোগের নীতি (Pleasure principle) মেনে চলে। আদিম সত্তা (Id) বা পশুত্ব হলো ব্যক্তিত্বের একটি প্রাথমিক সত্তা। এই সত্তাটি মানসিক শক্তির (Psychic energy) আধার। শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন সে শুধু একটি আদিম সত্তা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এবং তখন তার জৈবিক প্রেষণাগুলো (Biological motives) চরিতার্থ হলেই সে খুশি হয়।

আমিত্ব বা বাস্তবতা (Ego): শিশু বড় হতে থাকলে তার আদিম সত্তার সাথে যোগ দেয় আমিত্ব (Ego) ও নৈতিকতা (Super-ego)। সন্ত্রাসী, মাস্তান এ প্রকৃতির লোকদের বেলায় পশুত্ব বা আদিম সত্তা (ওফ) অন্য দু’টির চেয়ে বেশি থাকে। আমিত্ব (Ego) হলো ব্যক্তির একটি বাস্তব সত্তা। সে বাস্তবের সাথে আদিম সত্তার (Id) যোগাযোগ রক্ষা করে। তাই আমিত্ব কিছুটা চেতন এবং কিছুটা অবচেতন। প্রকৃতপক্ষে এই সত্তাটি বাস্তবের নীতি (Reality principle) অনুসরণ করে। আমিত্ব মানুষকে সামাজিক উপায়ে, বাস্তবসম্মত উপায়ে তার প্রেষণাগুলোকে (Motives) পূরণ করার জন্য প্রেরণা দেয়। স্কিজোফ্রেনিয়া রোগে ব্যক্তির আমিত্বের সীমানা (Ego boundary) নষ্ট হয়ে যায়।

নৈতিকতা (Super-ego): নৈতিকতা বা মানবতা (Super-ego) হলো ব্যক্তিত্বের নৈতিক হাতিয়ার। এই সত্তা বাস্তব অপেক্ষা আদর্শের প্রতি জোর দিয়ে থাকে। এর প্রধান কাজ ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা এবং ধর্মীয় ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিধান মেনে চলার প্রেরণা দেয়া। সামাজিক ন্যায়নীতির ভিত্তিতে এটি ব্যক্তিত্বকে গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করে। আসলে নৈতিকতা সৃষ্টি হয় সমাজের নিয়মকানুনের আত্তীকরণ থেকে। সমাজের শাস্তি এড়ানোর জন্য শিশু যখন সমাজের বিধিনিষেধকে নিজের বলে গ্রহণ করতে শেখে তখনই জন্ম হয় তার নৈতিকতা বা মানবতা।

নবজাতক শিশুর সবটুকুই পশুত্ব বা আদিম সত্তা (Id), তারপর যতই বয়স বাড়তে থাকে তার আমিত্ব (Ego) বোধ জাগ্রত হতে থাকে। তার বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হতে থাকে এবং আদিম কামনা-বাসনা বাস্তবসম্মত উপায়ে চরিতার্থ করার উপায় সে অনুসন্ধান করতে থাকে। অতঃপর নৈতিকতা বা মানবতা (Super-ego) জন্ম নেয়। মাতাপিতা, পরিবারের অন্যান্য সদস্য, স্কুলের শিক্ষক সবাই তাকে সমাজের ভালোমন্দ, ন্যায়-অন্যায়, ধর্মীয় বিধিনিষেধ প্রভৃতি সম্বন্ধে যেমনটি শেখান, ঠিক তেমনিভাবে গড়ে উঠে শিশুর নৈতিকতা। উল্লেখিত তিনটি সত্তার পৃথকীকরণের মধ্যে দিয়ে ব্যক্তিত্বের বিকাশের ধারা চলতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে আমিত্ব বা বাস্তবতার (Ego) দায়িত্বই বেশি। এক দিকে সে আদিম প্রবৃত্তি ও বাস্তবতার মধ্যে আপস ঘটায়, আবার অপর দিকে নৈতিকতা বা মানবতার (Super-ego) শাসনও তাকে মেনে চলতে হয়। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তাই আমিত্ব বা বাস্তবতাকে নানাবিধ মানসিক প্রতিরক্ষামূলক পদ্ধতির (Ego defence mechanism) আশ্রয় নিতে হয়। এগুলো পরবর্তী অনুচ্ছেদে দুশ্চিন্তা প্রতিরোধে মনের প্রভাব শিরোনামে আলোচিত হয়েছে।

ব্যক্তিত্বের গতিশীলতা (Personality dynamics)

ফ্রয়েডের মনোসমীক্ষণের আরেকটি ধারণা হলো, আমাদের বেশির ভাগ প্রেষণা ও চিন্তা আমাদের মনে অবচেতন স্তরে লুকায়িত থাকে, যাদের সম্পর্কে আমরা সজাগ থাকি না এবং ওইগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তিনি এখানে তিনটি অবস্থার কথা বলেছেন-

  • চেতনা (Concious),
  • প্রাক-চেতনা (Pre-concious),
  • অবচেতন (Unconcious),

মনের চেতন অংশটির প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমরা অবহিত। সাধারণ অবস্থায় মনের প্রাক-চেতন অংশটির প্রক্রিয়া আমাদের অজানা, তবে চেষ্টা করলে তাকে চেতন অবস্থায় আনা সম্ভব। অবচেতন মনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমরা অবহিত নই। আমাদের সচেতন মনের আচরণ ও চিন্তাধারার উপর অবচেতন মনের অংশের প্রভাব সীমাহীন। ফ্রয়েড বলেন, যখন আমাদের চিন্তা ও অনুভূতি আমাদের জন্য বেদনাদায়ক বা উদ্বিগ্নকারক হয় তখন সেগুলোকে আমরা আমাদের মনের অবচেতন স্তরে ঠেলে দিই বা অবদমন করি। তিনি মনে করেন চেতন, প্রাক-চেতন ও অবচেতন মনের মধ্যে রূপায়িত হয় আমাদের সত্তা, চিন্তা, কামনা, বাসনা, উদ্বেগ, দ্বন্দ্ব প্রভৃতি অনুভূতি। এক কথায় ব্যক্তিত্ব।

ব্যক্তিত্ব বিকাশে মনোযৌন স্তর (Psycho sexual stage of development)

ফ্রয়েড বিশ্বাস করেন, একজন শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশে প্রথম পাঁচ বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিত্ব বিকাশের বিভিন্ন পর্যায় বা ধাপকে তিনি নিম্নে বর্ণিত স্তরে ভ্যাখ্যা করেছেন (মানব মন ও আচরণে লিবিডোর ক্রমবিকাশ অধ্যায়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা করা হয়েছে)। এটাকে শৈশব যৌনতা মতবাদও ভলে থাকে। স্তরগুলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো-

মৌখিক বা মুখকাম স্তর (Oral stage)

শিশুর জন্মের পর থেকে এক বছর বয়স পর্যন্ত এই ধাপটি সীমিত। ফ্রয়েডের মতে, এই সময়ে শিশুর কামপ্রেষণা তার ঠোঁটে ও মুখে সীমাবদ্ধ থাকে। এই পর্যায়ে সে তার মায়ের বুকের দুধ চুষতে আনন্দ পায়। তারপর যখন তার দাঁত ওঠে তখন কামড়াতে বা চিবাতে সে আনন্দ পায়। ফ্রয়েড মনে করেন যে স্তন্যপান ও চর্বনক্রিয়ায় শিশুরা যে আনন্দ পায় সেটাই কামতৃপ্তির নামান্তর। তার মতে, প্রথম বছরে যদি শিশুর স্তন্যপানস্পৃহা পরিতৃপ্ত লাভ করে, তাহলে শিশু ভবিষ্যৎ জীবনে আশাবাদী হয়। কিন্তু শিশুর মুখকামিতা ব্যাহত হলে পরবর্তী কালে বক্রোক্তি, ব্যঙ্গোক্তি, অন্যকে আঘাত দিয়ে কথা বলা, আক্রমণাত্মক কথা বলা, তর্ক করা, বাঁশি বাজানো, সিগারেট ও মাদকাসক্তি প্রভৃতির প্রবণতা জেগে উঠতে পারে। আঙুল চোষা ও দাঁত দিয়ে নখকাটা অভ্যাসের ব্যাখ্যাও এভাবে দিয়ে থাকে অর্থাৎ মৌখিক স্থায়ীকরণের ফলে এগুলো হতে পারে বলে ফ্রয়েড বিশ্বাস করেন।

পায়ু বা পায়ুকাম স্তর (Anal stage):

এক থেকে তিন বছর বয়সে শিশুর পায়ু অঞ্চল খুব সংবেদনশীল থাকে এবং সে মলত্যাগ করে কামতৃপ্তি লাভ করে। মাতা-পিতা এ সময়ে শিশুকে যথাস্থানে পায়খানা প্রস্রাব করার প্রশিক্ষণ দেয়। ফ্রয়েডের মতে, মলত্যাগের প্রশিক্ষণের উপর ভিত্তি করে শিশুর পরবর্তী জীবনের মূল্যবোধ সৃষ্টি হয়। মা যদি প্রশিক্ষণের ব্যাপারে অনমনীয় হয় তবে শিশু মলত্যাগ না করে একে ধরে রেখে কোষ্ঠবদ্ধ করে কামতৃপ্তির বিকল্প পথ বেছে নেয়। পরবর্তী জীবনে সে কৃপণতা, একগুঁয়েমি, শুচিবাই, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা প্রভৃতি স্বভাব অর্জন করে বলে ফ্রয়েড মনে করেন।

লৈঙ্গিক বা লিঙ্গকাম পর্যায় (Phallic stage) :

তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সে এই স্তর সীমাবদ্ধ। এটাকে আত্মরতি স্তরও বলা হয়। কেননা শিশু তার নিজের যৌনাঙ্গের মধ্যে কাম তৃপ্তির উৎস আবিষ্কার করে। এই পর্যায়ে ফ্রয়েড গ্রিক পুরাণে উল্লিখিত দু’টি ঘটনাকে এখানে সংযোজন করেছেন, তা হলো ইডিপাস কমপ্লেক্র ও ইলেকট্রা কমপ্লেক্র। প্রথমটি ছেলেদের বেলায় এবং দ্বিতীয়টি মেয়েদের হয়ে থাকে বলে ফ্রয়েড মনে করেন। তাছাড়াও ফ্রয়েড বলেছেন- আরো দু’টি ঘটনা, যেমন- লিঙ্গচ্ছেদন আশঙ্কা ও পুরুষাঙ্গ হিংসা, প্রথমটি ছেলেদের বেলায় এবং দ্বিতীয়টি মেয়েদের বেলায় হয়ে থাকে। এই তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সের স্তরে সাধারণত ছেলেরা মায়ের প্রতি এবং মেয়েরা বাবার প্রতি স্বাভাবিক মনো আকৃষ্ট থাকে। কোনো কারণে যদি মাতাপিতাকে যথাক্রমে ছেলেমেয়েরা কাছে পেল না অথবা তাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক থেকে ব্যর্থ হলো তাহলে পরবর্তীকালে ছেলেমেয়েদের নানাবিধ মনোযৌন সমস্যা হতে পারে বলে ফ্রয়েড মনে করেন।

সুপ্তকাল (Latency period):

ছয় বছর থেকে যৌবনপ্রাপ্তির বয়স পর্যন্ত। এই সময়ে কাম প্রবৃত্তির কোনোরকম লক্ষণ দেখা যায় না। তাই এই সময়কে সুপ্তিকাল বলা হয়। এ সময় সে শুধু পরিবেশকে জানতে চায়।

যৌবনাগমন (Genital stage):

তেরো বছর থেকে যৌবনকাল পর্যন্ত এই পর্যায়ে ছেলেমেয়েদের মধ্যে কামানুভূতি সৃষ্টি হয়। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আগ্রহ দেখা দেয় বলে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা জাগে। এই কনসেপ্ট থেকে ছেলেমেয়েদের জন্য পৃথক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

ফ্রয়েডের ধারণার মূল্যায়ন

ফ্রয়েডকে অনেকেই এই বলে সমালোচনা করেছেন, তিনি ব্যক্তিত্বের বিকাশে ও সমগ্রভাবে ব্যক্তির আচরণে কামশক্তির প্রভাব নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করেছেন। বিশেষ করে নবজাতক শিশুর কামশক্তির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অনেক পন্ডিত ফ্রয়েডকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এই বলে যে, তিনি ব্যক্তিত্বের বিকাশে আদিম কামনার প্রভাব বা জৈবিক তাগিদগুলোর প্রভাবকেই সম্পূর্ণভাবে দায়ী করেছেন। কিন্তু সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রভাবকে একেবারেই উপেক্ষা করেছেন। ফ্রয়েডের তত্ত্বে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও মনোবিজ্ঞানে ও চিকিৎসাশাস্ত্রে এই তত্ত্বের প্রভাব অপরিসীম। তার তত্ত্বের কোনো কোনো ধারণা সমকালীন, মনোবিজ্ঞানীরা ও মনোচিকিৎসাবিদেরা সাদরে গ্রহণ করেছেন।

ডা. শাহজাদা সেলিম

এমবিবিএস, এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম)
এমএসিই (ইউএসএ)
হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা
কমফোর্ট ডক্টর’স চেম্বার
১৬৫-১৬৬, গ্রীনরোড, ঢাকা

পর্ব- ১ পড়তে ক্লিক করুন "ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাবেন কীভাবে "

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

স্বাস্থ্য টিপস এর সর্বশেষ খবর

স্বাস্থ্য টিপস - এর সব খবর



রে


রে