ঢাকা, বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৮ ফাল্গুন ১৪২৫

 

সুস্থ থাকতে নিয়মিত হাঁটুন

ডা. শাহজাদা সেলিম

২০১৫ মার্চ ০৪ ১৬:৪২:৫৮
সুস্থ থাকতে নিয়মিত হাঁটুন
ডা. শাহজাদা সেলিম

মহামতি হিপোক্রেটাস বলেছিলেন, হাঁটাহাঁটি হলো সবচেয়ে সেরা ওষুধ। গ্রিসের এই প্রখ্যাত ফিজিশিয়ানকে বলা হয় মেডিসিনের জনক। হিপোক্রেটাস নিঃসন্দেহে একজন জ্ঞানী ও স্মার্ট লোক ছিলেন। আজকাল অনেক দামি গবেষণা থেকেই এটা প্রমাণিত হয়েছে হাঁটা আপনার জন্য ভাল। গবেষণাগুলোর ফলাফল সত্যিই প্রভাবিত করার মতো। হাঁটায় ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ দুটোই কমে। সেইসঙ্গে কমে ব্লাডপ্রেসার, বাড়ে হাড়ের ঘনত্ব। আরও অনেক উপকার হয় নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করলে।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করে হাঁটাহাঁটি

ডায়াবেটিস প্রিভেনশন প্রোগ্রাম এক হিসেবে দেখিয়েছে, যাদের এখনো ডায়াবেটিস হয়নি, কিন্তু ডায়াবেটিস হওয়ার যথেষ্ট ঝুঁকি আছে তারা প্রতি সপ্তাহে ১৫০ মিনিট করে হেঁটে ও দেহের মাত্র ৭% ওজন (১২-১৫ পাউন্ড) হারিয়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে পারেন ৫৮%।

হৃদপিণ্ডের শক্তি বাড়ায় হাঁটাহাঁটি

এক গবেষণায় দেখা গেছে, কর্ম থেকে অবসরপ্রাপ্ত বা রিটায়ার্ড লোকদের মধ্যে যারা প্রতিদিন এক মাইলের কম হাঁটেন তাদের মৃত্যু হার দুই মাইলের চেয়ে যারা বেশি হাঁটবেন তাদের চেয়ে দ্বিগুণ। নার্সদের এক স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে (৭২,৪৮৮ জন মহিলা নার্স) যারা সপ্তাহে তিন ঘণ্টা বা তার চেয়ে বেশি সময় হাঁটেন তাদের হার্টএ্যাটাক কিংবা অন্যান্য হৃৎপিণ্ড সংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি কমে ৩৫%।

হাঁটাহাঁটি ব্রেইনের জন্য ভাল

হাঁটাহাঁটি ও জ্ঞান অর্জন সংক্রান্ত এক গবেষণায় গবেষকরা পেয়েছেন আরেক মজার তথ্য। যে সব মহিলা সপ্তাহে ৪০ মিনিটের চেয়ে কম সময় হাঁটেন তাদের চেয়ে সাপ্তাহিক দেড় ঘণ্টা হাঁটাহাঁটিতে অভ্যস্ত মহিলাদের জ্ঞান অর্জনের শক্তি অনেক ভাল। সেইসঙ্গে স্মৃতিশক্তি হারানোর প্রবণতাও তাদের মধ্যে কম। চিন্তা করুন একবার।

আপনার হাড়কে করবে মজবুত

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে রজঃনিবৃত্তি বা মেনোপজ পরবর্তী মহিলাদের ক্ষেত্রে যারা দৈনিক প্রায় এক মাইলের মতো হাঁটেন অন্য মহিলাদের চেয়ে তাদের দেহের হাড়ের গঠন অনেক বেশি দৃঢ় ও ঘন হয়।

অবসাদ দূর করতে

প্রতি দফায় ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে তিন থেকে পাঁচবার এবং এভাবে ১২ সপ্তাহ হাঁটাহাঁটি করলে তা ডিপ্রেশনের লক্ষণ অনেকাংশে কমায়। অবসাদের আদর্শ লিখিত প্রশ্নাবলী থেকে দেখা গেছে এটা ৪৭% পর্যন্ত কমে।

স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে

মহিলাদের মধ্যে যারা সপ্তাহে সোয়া ঘণ্টা থেকে আরম্ভ করে আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত এলোমেলোভাবে হলেও হাঁটাহাঁটি করেন তাদের ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় মহিলাদের চেয়ে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি ১৮% পর্যন্ত কমে। অন্যান্য গবেষণা থেকে দেখা গেছে, মলাশয়ের ক্যান্সার (কোলন ক্যান্সার) প্রতিরোধেও হাঁটার ভূমিকা রয়েছে।

ফিটনেস বাড়ায়

৩০ মিনিট করে সপ্তাহে কেবল তিনবার হাঁটাহাঁটি বেশ লক্ষণীয় মাত্রায় হৃৎপিণ্ড ও শ্বসনতন্ত্র সংক্রান্ত ফিটনেস বাড়িয়ে দেয়। অল্প পরিমাণে হাঁটাহাঁটিও আপনার ফিটনেস বাড়ায়।

যারা খুব আলসে টাইপের মেয়ে তাদের জন্য পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্বল্প সময় (১০ মিনিট করে দিনে তিনবার) এলোমেলো হাঁটাহাঁটি করলেও সেটা তাদের দেহের ফ্যাট কমানোর ক্ষেত্রে সমান উপকার করে যারা দিনে একবার আধাঘণ্টা করে হাঁটেন তাদের মতোই।

শারীর বৃত্তীয় উন্নতি ঘটে

গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁটাহাঁটির ফলে ফিটনেস ও শারীরবৃত্তীয় কাজকর্মের উন্নতি ঘটে। বৃদ্ধদের দৈহিক নানা অক্ষমতা প্রতিরোধ করতেও হাঁটার জুড়ি নেই। হাঁটাহাঁটি কেন করবেন তার লিস্টটা আরও লম্বা করা যায়। কিন্তু ততক্ষণে আপনার হাঁটার যে সময় ফুরিয়ে যাবে। বরং এটুকু বলাই মনে হয় যথেষ্ট- হাঁটা আপনার জন্য নিশ্চিতভাবেই উপকারী।

হাঁটার কোনো ধরন আছে কি?

আনুষ্ঠানিকভাবে হাঁটার দুটো ধরন আছে। পাওয়ার-ওয়াকিং (এটা স্পিড-ওয়াকিং নামেও পরিচিত) বা গতিশীল হাঁটা ও রেস-ওয়াকিং বা প্রতিযোগিতামূলক হাঁটা। এই দুই ধরনের হাঁটার ক্ষেত্রেই টেকনিক আছে। তাদের মধ্যে পার্থক্যটা হলো এই রেস-ওয়াকিং হলো অলিম্পিকের একটা স্পোর্টস ইভেন্ট যাতে নিয়মকানুন আছে। অন্যদিকে পাওয়ার-ওয়াকিং বেশ আনন্দের সঙ্গে হাঁটা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে ধরুন, রেস হাঁটার একটা নিয়ম আছে তা হলো এ্র্যাথলেটে পেছনের পায়ের পাতা মাটি ছাড়তে পারবে না যতক্ষণ না সামনের পায়ের গোড়ালি মাটি স্পর্শ করে। আসলে হাঁটার এ দুটো ধরনই এক্সারসাইজের জন্য চমৎকার যা আপনার ফিটনেস বাড়ায় এবং স্বাস্থ্য ভালো রাখে।

আরেক ধরনের হাঁটা আছে যার জন্য কোনো টেকনিকের দরকার নেই। আপনি কেবল বের হবেন ও হাঁটা আরম্ভ করবেন। এটাকে বলা যেতে পারে সনাতন হন্টন প্রক্রিয়া, এক পায়ের আগে আরেক পা। সারা জীবনই এভাবে হাঁটছেন আপনি। এটা থেকে প্রচুর উপকার পাওয়া সম্ভব। আর যদি হাঁটা থেকে বাড়তি কিছু সুবিধা পেতে চান তবে হাঁটাহাঁটির কয়েকটি সামান্য টেকনিকের দিকে খেয়াল করলেই ওই টিকেট পেয়ে যাবেন আপনি।

পায়ের কাজ

এক. নিয়মিত হাঁটা আরম্ভ করতে যাচ্ছেন যারা তাদের বেশিরভাগই যে ভুল করেন তা হলো দ্রুত হাঁটতে গিয়ে বড় বড় পায়ে হাঁটা শুরু করেন। নিয়ম অনুযায়ী বড় বড় পদক্ষেপে হাঁটা একরকম অদক্ষতার পরিচয়। এটা আপনার বাড়তি ক্যালরি খরচ করে (এটা অবশ্য ভাল ব্যাপারও হতে পারে)। কিন্তু আপনার হয়তো অল্প পরিমাণ ক্যালরিই খরচ করার দরকার আছে কারণ এতটা আপনি হয়তো হাঁটবেন না যাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

দুই. বড় বড় পদক্ষেপে দ্রুত হাঁটার বদলে সামনের পা যখন মাটির কাছাকাছি তখন শরীর দিয়ে জোরে ধাক্কা দেয়ার দিকে মনোযোগ দিন। সম্ভ্রান্ত হাঁটিয়েরা এভাবেই হাঁটেন।

পায়ের পাতার কাজ

এক. গোড়ালি থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত হাঁটুন। গতি বাড়ানোর জন্য পায়ের পাতা ফ্ল্যাট করে হাঁটার দরকার নেই।

দুই. গোড়ালি দিয়ে মাটি স্পর্শ করুন।

তিন. পায়ের পাতাকে রোল করে মাঝ বরাবর সামনের দিকে নিন।

চার. পায়ের আঙুল দিয়ে পেছনের দিকে ঠেলে দিন।

নিতম্ব

এক. হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে আপনার হিপকে সামনে ও পেছনের দিকে ঘোরান।

দুই. আপনার কোমর মোচড় খাওয়া উচিত। যারা বাজি ধরে হাঁটেন তাদের হন্টনভঙ্গি মজার মনে হয় কারণ তাদের হিপ ঘুরতে থাকে। হিপের বাধাপ্রাপ্ত নড়াচড়া আপনার গতিকেই কমিয়ে দেয়।

শরীরের ঊর্ধ্বাংশ

দেহের উপরের অংশ খাড়া রাখুন। সামনের দিকে ঝুঁকে বা বাঁকা হয়ে হাঁটলে আপনার গতি ধীর হয়ে যাবে।

বাহুর কাজ

এক. কনুই সমকোণ (৯০ ডিগ্রি) রাখুন।

দুই. হাতগুলো রিলাক্সে রাখুন।

তিন. হাত দুটোকে সামনে ও পেছনের দিকে দোলান এবং দেহের কাছাকাছিই রাখুন। দক্ষতা বজায় রাখার জন্য হাতকে দেহের মাঝ বরাবর ক্রস করানোর দরকার নেই।

চার. গতি বাড়ানোর জন্য হাত দোলানোর স্পিড বাড়িয়ে দিন। দেখবেন পা অটোমেটিক অনুসরণ করা আরম্ভ করেছে। এটা আসলেই কাজের।

মাথা, ঘাড় কাঁধ

আপনার ঘাড় ও কাঁধ রিলাক্স রাখুন। মাথা থাকবে খাড়া, দৃষ্টি সোজা সামনের দিকে।

তবে দেরি কিসের?

দরজা খুলে হাঁটতে বের হওয়ার মতোই সরল ব্যাপার এটা। আর এ ক্ষেত্রে আপনার সবচেয়ে ভাল সহযাত্রী হলেন আপনি। আমেরিকান প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে হাঁটাহাঁটি হলো সবচেয়ে জনপ্রিয় এক্সারসাইজ। এটার জন্য খুব বেশি সময়ের দরকার হয় না। দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই একে জুড়ে নিতে পারেন আপনি। কারণ পুরোজীবন ধরেই এটা করছেন আপনি। স্বাস্থ্যগত সুবিধা অনেক আর যে কোনো জায়গাতেই এটা করা সম্ভব। একবার আরম্ভ করলেই এটার আনন্দটা টের পাবেন আপনি। তাহলে আর অপেক্ষা কিসের? এক চক্কর ঘুরে আসুন এক্ষুণি।

ডা. শাহজাদা সেলিম

এমবিবিএস, এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম)
এমএসিই (ইউএসএ)
হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা
কমফোর্ট ডক্টর’স চেম্বার
১৬৫-১৬৬, গ্রীনরোড, ঢাকা

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

স্বাস্থ্য টিপস এর সর্বশেষ খবর

স্বাস্থ্য টিপস - এর সব খবর



রে


রে