ঢাকা, বুধবার, ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ৩ মাঘ ১৪২৫

শিশুর অপুষ্টি দূর করার ‍উপায়

২০১৫ আগস্ট ০৮ ১৮:০৩:৫১
শিশুর অপুষ্টি দূর করার ‍উপায়

আমাদের দেশে ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৬ লাখ শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে আক্রান্ত। এই শিশুরা প্রায়ই অসুস্থ থাকে এবং তাদের মৃত্যুর ঝুঁকিও বেশি। সাধারণত পুষ্টিকর খাবারের অভাবে অথবা কোনো অসুখের কারণে পুষ্টির অভাব হলে আকস্মিকভাবে শিশুর ওজন কমে যায়, দুই পায়ে পানি আসে।

অপুষ্টির লক্ষণ : মারাত্মক অপুষ্টিতে আক্রান্ত একটি শিশুর মধ্যে নিম্নলিখিত উপসর্গগুলো দেখা যায়—

১। রোগা পাতলা শরীর, দেখে মনে হবে বুড়ো হয়ে গেছে।
২। শিশুটি একেবারে চুপচাপ, দুর্বল এমনকি কান্না করারও শক্তি নেই।
৩। বুকের পাঁজরের হাড় ও শরীরের অন্যান্য হাড় সহজেই চোখে পড়ে।
৪। চামড়াগুলো ঝুলে পড়ে।
৫। পেছন থেকে ঘাড় ও পাজরের হাড় স্পষ্ট চোখে পড়ে।
৬। মারাত্মক ধরনের ওজন হ্রাস পেলে মনে হবে পুরো শরীর থেকেই চামড়া ঝুলে পড়েছে।

এ ধরনের শিশুদের শরীরের চর্বি ও মাংসপেশি শুকিয়ে যায় এবং সমবয়সী সুস্থ আরেকটি শিশুর তুলনায় তার ওজন অনেক কমে যায়।

পায়ে পানি আসা রোগীদের নিচের লক্ষণগুলো থাকতে পারে—

১। চাঁদের মতো গোল মুখ।
২। ডারমাটোসিস–চামড়ায় সাদাকালো ছোপ ছোপ দাগ, দগদগে ঘা।
৩। উদাসীন, দুর্বল।
৪। খাওয়ার রুচি নষ্ট হওয়া।
৫। চুলের রং পরিবর্তন।
৬। খুব সহজেই বিরক্ত হয়, সারাক্ষণ কান্না করে।

অপুষ্টির মাত্রা নির্ণয়

মুয়াক (MUAC–Mid Upper Arm Circumference) পরিমাপ করে কমিউনিটি পর্যায়ে মারাত্মক অপুষ্টি দ্রুত নির্ণয় করা যায়। মুয়াক পরিমাপ করা হয় মুয়াক ফিতা দিয়ে। স্বাভাবিক পুষ্টি অবস্থায় ৬-৫৯ মাসের শিশুদের জন্য এটি > ১২.৫ সে.মি.। মারাত্মক তীব্র অপুষ্টি ( SAM)-এর ক্ষেত্রে এটি <১১.৫ সে.মি. এবং মাঝারি তীব্র অপুষ্টি ( MAM)-এর ক্ষেত্রে এটি ১১.৫ - <১২.৫ সে.মি.।

চিকিৎসা

জটিলতাবিহীন মারাত্মক তীব্র অপুষ্টি (SAM) আক্রান্ত শিশুদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাড়িতে রেখে অপুষ্টি চিকিৎসার খাবার দিয়ে চিকিৎসা করা যায়। কিন্তু জটিলতাসহ মারাত্মক তীব্র অপুষ্টি আক্রান্ত শিশুকে হাসপাতালের অন্তঃ বিভাগে ভর্তি রেখে চিকিৎসা প্রদান করতে হয়।

জটিলতা বলতে বোঝায়

১। দুই পায়ে পানি আসা।
২। নিচের যে কোনো লক্ষণসহ মুয়াক <১১.৫ সে.মি.।
ক) রুচি নাই/খেতে পারে না।
খ) ক্রমাগত বমি (প্রতি ঘণ্টায় > ৩ বার)।
গ) জ্বর (বগলের তাপমাত্রা > ১০২.২ ডিগ্রি ফারেনহাইট)।
ঘ) হাইপথারমিয়া (বগলের তাপমাত্রা < ৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট)।
ঙ) শিশুর বয়সের তুলনায় দ্রুত শ্বাস –
শিশুর বয়স < ২ মাস, শ্বাস ≥ ৬০/ মিনিট।
শিশুর বয়স < ২ – ১২ মাস, শ্বাস ≥ ৫০/ মিনিট ।
শিশুর বয়স < ১২-৫৯ মাস, শ্বাস ≥ ৪০/ মিনিট।
চ) ডায়েরিয়া, বমি অথবা জ্বরের কারণে পানিস্বল্পতা, গত ১২ ঘণ্টার মধ্যে প্রস্রাব না হওয়া।
ছ) মারাত্মক ফ্যাকাশে হওয়া।
জ) খুব বেশি দুর্বলতা, অনাগ্রহ, অজ্ঞান, খিঁচুনি।
ঝ) শিরাপথে স্যালাইন প্রয়োগের বা নাকে নলের মাধ্যমে খাওয়ানোর প্রয়োজন হওয়া।

জটিলতাবিহীন মারাত্মক তীব্র অথবা মাঝারি অপুষ্টি ব্যবস্থাপনায় খিচুড়ি ও হালুয়ার মতো স্থানীয় খাবার ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশুর বৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে তৈরি করা খাবারে প্রয়োজনীয় অনুপুষ্টি পাউডার (Micronutrient powder) যুক্ত করতে হবে।

শক্তি ও পুষ্টি সমৃদ্ধ স্থানীয় খাবার প্রস্তুত প্রণালী

খিচুড়ি
উপাদান ১ কেজির জন্য পরিমাণ
চাল-১২০ গ্রাম
মশুর ডাল-৬০ গ্রাম
তেল (সয়াবিন)-৭০ মিলি
আলু-১০০ গ্রাম
মিষ্টি কুমড়া-১০০ গ্রাম
পাতাযুক্ত সবজি (শাক)-৮০ গ্রাম
পেঁয়াজ (২টি, মাঝারি আকারের)-৫০ গ্রাম
মশলা (আদা, রসুন, হলুদ, ধনিয়া)-৫০ গ্রাম
পানি-১০০০ মিলি
মোট শক্তি/কেজি- ১,৪৪২ কিলোক্যালরি

ব্যবহার বিধি

চাল, মশুর ডাল, তেল, পেঁয়াজ, মশলা ও পানি একটি পাত্রে নিয়ে সিদ্ধ করুন। আলু ও কুমড়া কেটে টুকরা করুন ও ২০ মিনিট পরে পাত্রটিতে ঢালুন। রান্না শেষ হওয়ার ৫ মিনিট আগে কাটা ও পরিষ্কার করে ধোয়া শাকসবজি তাতে ঢেলে দিন। রান্না করার পুরোটা সময় ধরে পাত্রটি ঢেকে রাখতে হবে। খিচুড়ি রান্না হতে ৫০ মিনিটের মতো সময় লাগে ও স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ৬-৮ ঘণ্টা ঘরে সংরক্ষণ করা চলে।

হালুয়া
উপাদান-১ কেজিতে পরিমাণ
আটা- ০০ গ্রাম
মশুর ডাল-১০০ গ্রাম
তেল (সয়াবিন)-১০০ গ্রাম
গুড়-১২৫ গ্রাম
পানি (ঘন লেই তৈরি করার জন্য)-৬০০ মিলি
মোট শক্তি/কেজি- ২,৪০৪ কিলক্যালরি

ব্যবহার বিধি

৩০ মিনিট ধরে মশুর ডাল পানিতে ভিজিয়ে রাখুন এবং এর পর বাটুন বা গুঁড়া তৈরি করুন। গরম তাওয়ায় আটা কয়েক মিনিট ভাজুন, তারপর বাটা মশুরের লেই, তেল ও পানির সঙ্গে মিশিয়ে নিন। গুড় গুলিয়ে নিন এবং মিশ্রণের সঙ্গে মিশিয়ে নিন যাতে গাঢ় লেই তৈরি হয়। হালুয়া তৈরি হতে ১৫ মিনিট সময় লাগে ও স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ৬-৮ ঘণ্টা ঘরে রাখা চলে।

বাড়তি খাবার সম্পর্কিত সুপারিশসমূহ

বয়স

দিনে কত বার খাওয়াবেন

প্রতিবার কতটুকু পরিমাণ খাওয়াবেন

পূর্ণ ৬ মাস – পূর্ণ ৮ মাস

২ বার ভারী খাবার এবং

১-২ বার পুষ্টিকর নাস্তা

২৫০ মিলি বাটির আধা বাটি

৯ মাস – পূর্ণ ১১ মাস

৩ বার ভারী খাবার এবং

১-২ বার পুষ্টিকর নাস্তা

২৫০ মিলি বাটির আধা বাটি

১২ মাস – পূর্ণ ২৩ মাস

৩ বার ভারী খাবার এবং

১-২ বার পুষ্টিকর নাস্তা

২৫০ মিলি বাটির এক বাটি

উৎসাহিত হয়ে নিজেই খাবার খাওয়া

ধৈর্য ধরুন এবং আপনার শিশুকে নিজেই খাবার খেতে উৎসাহিত করুন

পরিচ্ছন্নতা

* শিশুকে পরিষ্কার কাপে বা চামচে খাওয়াতে হবে, কোনোভাবেই বোতলে নয়, কেননা এটা পরিষ্কার করা কঠিন এবং এতে শিশুর ডায়রিয়া হতে পারে।

* খাবার তৈরি করার পূর্বে, খাওয়ার পূর্বে এবং শিশুকে খাওয়ানোর পূর্বে সাবান দিয়ে ভাল করে হাত ধুয়ে নিন।

খাবারের ঘনত্ব

* পূর্ণ ৬ মাস – পূর্ণ ৮ মাস – ঘন হালুয়া / জাউ / মণ্ড জাতীয় / চটকানো পারিবারিক খাবার ।
* ৯ মাস – পূর্ণ ১১ মাস – মিহি করে কাটা পারিবারিক খাবার, আঙ্গুলে তুলে খাওয়ার খাবার, টুকরো করা খাবার ।
* ১২ মাস – পূর্ণ ২৩ মাস – পারিবারিক খাবার, টুকরো করা খাবার।

খাবারের বৈচিত্র্য

* বুকের দুধ + প্রধান খাবার (ভাত, সুজি, হালুয়া, খিচুড়ি, রুটি
* বুকের দুধ + প্রধান খাবার ( ভাত , সুজি, হালুয়া, খিচুড়ি , রুটি) + ডাল জাতীয় খাবার (মশুর, শিম, মটর) + সবজি/ফল (সবুজ শাকসবজি, পেঁপে, আম, কলা, কাঁঠাল) + প্রাণিজ খাবার (মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, পনির)।

লেখক
ডাঃ ইউ,কে,এম, নাজমুন আরা
এম,বি,বি,এস; এফ,সি,পি,এস (শিশু); শিশু বিশেষজ্ঞ
জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু)
প্রাক্তন আবাসিক চিকিৎসক (শিশু); ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সুস্বাস্থ্য প্রতিদিন এর সর্বশেষ খবর

সুস্বাস্থ্য প্রতিদিন - এর সব খবর



রে


রে