ডা. শাহজাদা সেলিম

৭ এপ্রিল বিশ্বস্বাস্থ্য দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘খাদ্য নিরাপত্তা (Food Safety)’। পৃথিবীর যেকোনো দেশের মানুষের প্রধান মৌলিক অধিকার হল খাদ্য। খাদ্য মানে শুধু খাদ্যদ্রব্য নয়, আদর্শ, ঝুঁকিমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য। মানুষের শারীরিক সুস্থতা, দৈহিক বৃদ্ধি, মানসিক পরিপূর্ণতা, প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ইত্যাদির জন্য নিরাপদ খাদ্য জরুরীতম প্রয়োজন। আবার কোনো দেশের সামাজিক সুস্থতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে রাষ্ট্রীয় উন্নতির সকল কাঠামোতেই তার নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি, যা নিশ্চিত হতে পারে নিরাপদ খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে। অথবা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে অনিরাপদ খাদ্যের কারণে।

উন্নত দেশগুলো মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সাংবিধানিক আইন প্রণয়ন করেছে। আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করেছে, জনগণকে এ ব্যাপারে সচেতন করেছে এবং জনমত তৈরী করেছে। কানাডার নাম এ ব্যাপারে সর্বাগ্রেই আসবে। নরওয়ে, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের প্রায় সবকটি দেশ, উত্তর আমেরিকার সবকটি দেশ, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি দেশ তাদের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশে নাগরিকদের নিরাপদ খাদ্যের বিধান প্রায় সুনিশ্চিত করেছে। এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশের অধিকাংশ দেশের চিত্র ভয়াবহ রকমের খারাপ। এশিয়ার উন্নত দেশগুলোর শীর্ষে স্থানের দেশ জাপান, সিঙ্গাপুর তার জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা কিছুটা নিশ্চয়তা প্রদান করতে সমর্থ হয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় আমাদের দেশের অবস্থানের কথা বললে বলতে হয়, এখন পর্যন্ত যে ক’টি দেশের রাষ্ট্রীয় খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে খারাপ তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি খাদ্য নিরাপত্তা আইন, যার প্রয়োগ অতিমাত্রায় সীমিত। অবশ্য, সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ সরকার গ্রহণ করেছ— জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (Food Safety Authority) গঠন করে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদন থেকে সংগ্রহ করা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত বা রান্না করা, খাদ্যগ্রহণ পদ্ধতি, অবশিষ্ট খাদ্য সংরক্ষণ , উচ্ছিষ্ট খাদ্যদ্রব্য নিষ্কাশন; সব ব্যাপারেই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি আমাদের মাঝে প্রকট। খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটার বিবিধ কারণ থাকতে পারে। প্রথমত খাদ্যগ্রহণকারী বাড়িতে খাদ্য প্রস্তুতকারী, বিতরণকারী, সংরক্ষণকারী এবং হোটেল-রেস্টুরেন্টে খাদ্য প্রস্তুতকারী, বিতরণকারী, সংরক্ষণকারীর অসচেতনতা বা অজ্ঞতা সঠিক খাদ্যগ্রহণের অন্তরায় হতে পারে। আবার খাদ্যশস্য, শাক-সব্জি বা ফলমূল উৎপাদনকালীন ব্যবহৃত কীটনাশক, সার ইত্যাদি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর উপাদান কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত খাদ্যগ্রহণকারীর খাদ্য উপাদান ও খাদ্যগ্রহণ পদ্ধতি, ধারণা বা অভ্যাস নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক কোনো গবেষণা হয়নি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পরিচালিত একটি গবেষণা বাংলাদেশের একটি এলাকার পরিবারের খাদ্য প্রস্তুতকারীর এ সম্পর্কে জ্ঞান, অভ্যাস ইত্যাদির তথ্য পাওয়া যায়। তথ্যে দেখা যায়, খাদ্য প্রস্তুতকারীদের প্রায় অর্ধেকের স্বাস্থ্যকর খাদ্য সম্পর্কে বিশেষ কোনো ধারণা নেই। ব্যাপকভিত্তিক গবেষণা হলে প্রকৃত তথ্য জানা যেত।

খাদ্যশস্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কিছু কিছু মারাত্মক দূষণ ঘটতে পারে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী দূষণ ছড়াতে পারে পাতাযুক্ত শাক-সব্জির মাধ্যমে। জমিতে যে ব্রোমাইড ছড়ানো হয় তা এ দূষণ ঘটাতে পারে। কীটনাশক স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী দূষণ ঘটায়। এক্ষেত্রে শাক-সব্জি, ফলমুল সবই দূষণ ছড়াতে পারে। কারখানায় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থায়ও অনেক রকম দূষণ ছড়াতে পারে। কেমিক্যাল বা রাসায়নিক দূষণ এক্ষেত্রে প্রধান হলেও জীবাণু ঘটিত দূষণও এক্ষেত্রে ঘটতে পারে। রাসায়নিক দূষণ ঘটায় যে সব পদার্থ তার মধ্যে আছে আর্সেনিক, পারদ, সীসা ও অন্যান্য ভারী ধাতু।

খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করতে গিয়ে যে সব রাসায়নিক পদার্থের দূষণ ঘটতে পারে তা হল— নাট্রোসামাইন, এ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন, ফ্যাটারোসাইক্লিক এ্যামাইন্স, মিস্টামিন, এ্যাপ্রেলামাইড, ফুরান, বেনজিন, ট্রান্সফ্যাট, হাইড্রোক্সিনোন্যানাল, ইথাইলকার্বোনেট ইত্যাদি।

খাদ্য পরিবহনেও বিভিন্ন রকম দূষণ ঘটতে পারে। এগুলো সাধারণত খাদ্য প্যাকেটজাত করা, সংরক্ষণ কাজে প্রিজারভেটিভ হিসেবে কাজ করছে। এক্ষেত্রে রাসায়নিক ও জীবাণু; দুই রকমই দূষণ ঘটতে পারে। জীবাণুঘটিত দূষণগুলো সাধারণত বিভিন্ন ধরনের ডায়রিয়া ঘটাতে পারে। আর প্রিজারভেটিভগুলো এলার্জি থেকে শুরু করে নানা রকম শারীরিক সমস্যা তৈরী করে।

খাদ্যে ভেজাল মেশানো একটি বড় সমস্যা আমাদের দেশে। এ ব্যাপারেও সুনির্দিষ্ট তথ্যের ঘাটতি আছে। কিন্তু প্রাত্যহিক জীবনে আমরা সবাই কম-বেশী এ ভোগান্তির শিকার। মাছ, মাংস থেকে শুরু করে শাক-সব্জি, ফলমুল, গুঁড়া মসলা, শিশুখাদ্য, পানীয় কোনো কিছুই এর বাইরে নেই সম্ভবত। গত বছর এবং তার কিছু আগের সময়কালটাতে ফলমুল, মাছে ফরমালিন মেশানো নিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। প্রচুর আম, মাছ ইত্যাদি ধ্বংস করা হয়।

খাদ্যে ফরমালিন মিশ্রণ মারাত্মক হতে পারে, যা খাদ্যতন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র, হৃদযন্ত্র, কিডনি ও স্নায়ুর জন্য ব্যাপক ঝুঁকি তৈরী করতে পারে। ক্যান্সার হবার ঝুঁকিও বেড়ে যাবার আশঙ্কা করা হয়। ফরমালিন মূলত মর্গে মৃতদেহ বা মেডিকেল কলেজের এ্যানাটমি বিভাগের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের পচন রোধ করতে ব্যবহার করা হয়। একই ফরমালিন (ফরমালডিহাইড) বিভিন্ন খাদ্যে বিশেষ করে মাছ, দুধ, ফলমুল ইত্যাদিতে মেশানো হচ্ছে যাতে তা পচে না যায়। এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন উঠলেও পদ্ধতিগত গবেষণা হয়েছে খুব সামান্যই। আমাদের দেশে খাদ্যে ফরমালিন শনাক্ত করতে যে কিটগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলো প্রধানত পরিবেশ বা বাতাসের ফরমালিন শনাক্ত করতে পারে, তরল বা কঠিন খাদ্যদ্রব্যের নয়। তাই খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন দূষণে সঠিক মাত্রা বা তীব্রতা অনুমেয় নয়।

রাস্তাঘাটে বিক্রি হওয়া খাদ্যদ্রব্যগুলো দূষণ ছড়ানো অন্যতম বাহক হতে পারে। এ খাবারগুলোর অধিকাংশ খুবই জনপ্রিয়। যেমন— চটপটি, ফুসকা, ঝালমুড়ি, চানাচুর, সিংগাড়া, পুরি, পেঁয়াজু, বেগুনী, ফলের রস, শরবত ইত্যাদি। এগুলোর প্রস্তুত প্রক্রিয়া পুরোপুরি অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় হয়। এগুলোর প্রস্তুতকারীর স্বাস্থ্যভাবনা খুবই সামান্য। খাদ্যগ্রহণকারীরও বিশেষ কোনো স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করতে দেখা যায় না। ডায়রিয়া, আমাশয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম জন্ডিস ছড়ানোর কারণ হতে পারে এ খাবারগুলো।

তবে আশার বিষয় হল বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে বেশ কিছু আইন প্রণয়ন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত মাসে খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়েছে। আমরা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাই যে, এ কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে। তবে একই সাথে দেশের সকল নাগরিককে ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে সচেতন হতে হবে ও উদ্যোগ নিতে হবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ

চেম্বার : কমফোর্ট ডক্টর’স চেম্বার, ১৬৫-১৬৬, গ্রীনরোড, ঢাকা