ডা. শাহজাদা সেলিম

থায়রয়েডের হরমোনের তারতম্যজনিত সমস্যা দুই রকম হতে পারে। যেমন- শরীরে থায়রয়েড হরমোনের পরিমাণ কমে গেলে বা হাইপোথায়রয়েডিজম, আবার বেড়ে গেলে হাইপারথায়রয়েডিজম। হাইপোথায়রয়েডিজমের রোগের সংখ্যা হাইপারথায়রয়েডিজমের চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের দেশে সেটি আরও প্রকট। বাংলাদেশের আয়োডিন ঘাটতিজনিত ব্যাপক জনগোষ্ঠী এ সমস্যায় আক্রান্ত। আমাদের সামগ্রিক জীবনমানের ওপর থায়রয়েড হরমোন ঘাটতি সুগভীর ঋণাত্মক প্রভাব বিস্তার করে আছে। আমাদের দেশে ব্যাপকসংখ্যক নির্বোধ মানুষ, বন্ধ্যা দম্পতি ও স্থূলদেহী জনগোষ্ঠীর পেছনে হাইপোথায়রয়েডিজম অন্যতম ক্রীড়ানক।

লক্ষণ

ক) সাধারণ লক্ষণসমূহ
১) অবসাদগ্রস্ততা, ঘুম ঘুম ভাব;
২) ওজন বৃদ্ধি;
৩) ঠাণ্ডা সহ্য করতে না পারা;
৪) গলার স্বরের কোমলতা কমে যাওয়া এবং অনেকটা ভারি বা কর্কশ শোনানো;
৫) গলগণ্ড নিয়ে প্রকাশ করতে পারে।

খ) হার্ট ও ফুসফুসের সমস্যা
১) হৃদস্পন্দন কমে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, বুকে ব্যথা অনুভব করা অথবা হার্ট ফেইলর হতে পারে;
২) হৃদযন্ত্রের আবরণে অথবা ফুসফুসের আবরণে পানি জমা।

গ) স্নায়ু ও মাংসপেশীর সমস্যা
১) মাংসপেশীতে ব্যথা বা শক্ত চাপ অনুভব করা;
২) স্নায়ু ও মাংসপেশীনির্ভর রিফ্লেক্স কমে যাওয়া;
৩) বধিরও হতে পারে;
৪) বিষণ্নতা ও মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা;
৫) মাংসপেশীর টান কমে যাওয়া।

ঘ) চর্ম বা ত্বকের সমস্যা
১) শুষ্ক, খসখসে ও ব্যাঙের ত্বকের মতো হয়ে যাওয়া;
২) ভিটিলিগো নামক এক ধরনের শ্বেতী রোগে আক্রান্ত হওয়া;
৩) চর্মে মিক্সিডিমা নামক এক ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়া।

ঙ) প্রজননতন্ত্রে সমস্যা
১) মাসিকের সময় বেশি রক্তপাত হওয়া;
২) বাচ্চা হওয়ার ক্ষমতা নষ্ট হওয়া;
৩) প্রজননে অক্ষমতা।

চ) পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা
১) পায়খানা শক্ত হওয়া;
২) পেটে পানি জমতে পারে।

হাইপোথাইরয়েডিজম হলে শিশুদের বেলায় অবর্ধনজনিত রোগ বা ক্রিটিনিজম হবে এবং উঠতি বয়স্কদের বা প্রাপ্তবয়স্কদের মিক্সিডিমা হয়। ক্রিটিনিজমের লক্ষণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মাংসপেশী ও হাড় এবং স্নায়ুতন্ত্রের সঠিক বর্ধন না হওয়া। এর ফলে শিশু বেঁটে হয়, বোকা বা বুদ্ধিহীন হয়ে থাকে। জিহ্বা বড় হবে ও মুখ থেকে বেরিয়ে আসে এবং নাভির হার্নিয়া হয়। হাইপোথাইরয়েডিজম হওয়ার উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে অটোইমিউন ধ্বংসপ্রাপ্ত, ওষুধ, টিএসএইচস্বল্পতা, গর্ভাবস্থায় মায়ের থাইরয়েড হরমোনস্বল্পতা ইত্যাদি।

কম হরমোনের চিকিৎসা
রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতিও ভিন্ন। তবে অধিকাংশ রোগীই ভোগেন হাইপোথারয়েডিজম অর্থাৎ তাদের থাইরয়েড গ্ল্যান্ড থেকে কম পরিমাণ থাইরয়েড হরমোন থাইরক্সিন নিঃসৃত হয়। এই ঘাটতি পূরণ করার জন্য ডাক্তাররা তাদের থাইরক্সিন ট্যাবলেট খাওয়ার পরামর্শ দেন। প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে ১০০ থেকে ২০০ মাইক্রোগ্রাম থাইরক্সিন দেওয়া হয়।

ওষুধ খাওয়ার নিয়ম
সারাজীবন ওষুধ খেতে হবে কি-না তা রোগের ধরনের ওপর নির্ভরশীল। যার থাইরক্সিন ঘাটতি সামান্য, উপসর্গও কম তার সারাজীবন ওষুধ খাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ৬ মাস থেকে ২ বছরেই সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে। অনেকে ওষুধ ছাড়াও সুস্থ হয়ে যান। কিন্তু যার একেবারেই থাইরক্সিন নিঃসরণ হয় না বা কোনো কারণে থাইরয়েড গ্ল্যান্ডটাকেই কেটে বাদ দিতে হয়েছে তাদের সারাজীবন ওষুধ না খেয়ে উপায় নেই।

ওষুধ খাওয়া হঠাৎ বন্ধ করা সম্পর্কিত বিষয়
ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করা যেতে পারে। তবে নিজের ইচ্ছায় ওষুধ খাওয়া বন্ধ করলে অল্পদিনের মধ্যেই রোগটা ভয়ঙ্করভাবে ফিরে আসবে। জীবন সংশয় হতে পারে।

ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
ওষুধের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। কারণ শরীরে স্বাভাবিকভাবে যেটুকু থাইরক্সিন হরমোন থাকা দরকার সেটি নেই বলেই তো বাইরে থেকে তা গ্রহণ করতে হয়। এককথায় ঘাটতি পূরণ। সারাজীবন খেলেও কোনো অসুবিধা হয় না।

রক্ত পরীক্ষা
চিকিৎসা চলাকালীন বছরে অন্তত একবার রক্তে থাইরক্সিন বা T4 এবং TSH পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।

ডা. শাহজাদা সেলিম
সহকারী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ
কমফোর্ট ডক্টর’স চেম্বার
১৬৫-১৬৬, গ্রীনরোড, ঢাকা
ফোন : ৮১২৪৯৯০, ৮১২৯৬৬৭ এক্স- ১১৯
E-mail: selimshahjada@gmail.com