অটিজম একটি বিকাশগত প্রতিবন্ধকতা, যা মস্তিষ্কের স্নায়ুবিক সমস্যার কারণে হয়ে থাকে। অটিজমকে বলা হয় একগুচ্ছ অস্বাভাবিক আচরণের সমন্বয় (a cluster of abnormal types of behaviour)। সাম্প্রতিক সময়ে অটিজমকে বিশেষজ্ঞরা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার বলে আখ্যায়িত করেছেন। এর আওতায় অল্প মাত্রার অটিজম হতে তীব্র মাত্রার অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের অবস্থান।

১৯৪৩ সালে জন হপকিনস হাসপাতালের ডা. লিও কান্নের এবং প্রায় একই সময়ে জার্মান বিজ্ঞানী ডা. হ্যান্স এসপারজার সমস্যাটি সম্বন্ধে বিস্তারিত জনসমক্ষে উপস্থাপন করেন। তার আগে এটি থাকলেও এ সম্বন্ধে তেমন কোনো ধারণা ছিল না। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতে অটিজম নিয়ে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে।

অটিজমের ব্যাপ্তি : সম্প্রতি জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১৫০ জন শিশুর ভিতর একজন অটিস্টিক। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ২৫০ জনে একজন অটিজমে আক্রান্ত। বাংলাদেশে শহরভিত্তিক একটি জরিপে দেখা যায়, ১০০০ জনে তিনজন শিশু অটিস্টিক। ছেলে/মেয়ে= ৪ : ১। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৮ সাল থেকে ২ এপ্রিলকে ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২০০৯ সাল থেকে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্রে অটিজম দ্রুত শনাক্তকরণ ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারিত হচ্ছে।

অটিজমের কারণ : এখনো পর্যন্ত অটিজম কেন হয় তার সঠিক কারণ উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। মনোবিকাশের প্রতিবন্ধকতার কারণ হিসেবে মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক জৈব রাসায়নিক কার্যকলাপ, মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক গঠন, বংশগতির অস্বাভাবিকতা থেকে এই সমস্যা হতে পারে বলা হলেও নির্দিষ্ট করে কিছু এখনো জানা সম্ভব হয়নি। জন্ম পরবর্তীকালের কোনো জটিলতা কিংবা শিশুর প্রতি অমনোযোগিতার ফলে এই সমস্যার সৃষ্টি হয় না। কাজেই কোনো বাবা মা ও আত্মীয়-স্বজন নিজেদের দোষী ভাবা অথবা মাকে দায়ী করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

মূল লক্ষণসমূহ : ১। শিশুর সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন ও সামাজিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা।

২। শিশুর স্বাভাবিক যোগাযোগ স্থাপনে প্রতিবন্ধকতা।

৩। শিশুর সীমাবদ্ধ গণ্ডি এবং পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ ও আগ্রহ।

সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে প্রতিবন্ধকতা : এই শিশু অন্যের সাথে চোখে চোখে তাকায় না। হাসি, ইশারা, অঙ্গভঙ্গি দ্বারা সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না, সমবয়সীদের সাথে খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করে না।

যোগাযোগ স্থাপনে প্রতিবন্ধকতা : এই শিশু বয়স অনুযায়ী ভাষার ব্যবহার করতে পারে না। ইশারা ইঙ্গিত দ্বারা অন্যের সাথে যোগাযোগ তৈরিতেও সমস্যা হয়। কখনো কখনো শিশুর ভাষার বিকাশ বিলম্বিত হয়। অন্যের শোনা কথা পুনরাবৃত্তি করে, কখনো কখনো বার বার একই কথা বলতে থাকে। আবার কখনো আমির বদলে তুমি ব্যবহার করে থাকে, যেমন ‘আমি ভাত খাব’ না বলে সে বলে ‘তুমি ভাত খাবা’।

সীমাবদ্ধ এবং পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ ও আগ্রহ : এদের আগ্রহ কোনো বিশেষ দুই-একটি বস্তুতে, কাজে সীমাবদ্ধ থাকে এবং বার বার সেই একই কাজ একইভাবে করতে থাকে। দেখা যায়, তীব্র পছন্দের কাজটি ছাড়া অন্য বস্তু বা কাজে তারা মনোযোগ দিতে পারে না। এ ছাড়া যেকোনো খেলার ক্ষেত্রে তারা কল্পনা বা সৃজনশীলতার সংমিশ্রণ ঘটাতে পারে না।

অটিজম শনাক্তকরণের জন্য এই তিনটি প্রতিবন্ধকতার লক্ষণসমূহ শুরু হতে পারে আঠারো মাস বয়স থেকে তবে ছত্রিশ মাস বয়সের পূর্বে অবশ্যই উপস্থিত থাকবে।

এদের নাম ধরে ডাকলেও সাড়া দেয় না। আদর করলেও ততটা সাড়া দেয় না। পরিবেশ এবং আশপাশের কোনো পরিবর্তন খুব অপছন্দ করে। সাধারণত দোলনা/রকিং চেয়ার বা এই জাতীয় পুনরাবৃত্তিমূলক খেলা পছন্দ করে। সাধারণত খেলনা দিয়ে কোনো গঠনমূলক খেলা খেলতে পারে না অথবা কোনো বিশেষ খেলনার প্রতি অত্যধিক মোহ দেখা যায়। এরা মাকে বা অন্যকোনো প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরে না এবং তাদের কেউ ধরলেও তেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় না অথবা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। কোনো বিশেষ কিছুর প্রতি অত্যধিক আকর্ষণ থাকে যেমন— কাগজ ছেঁড়া, পানি, তরল পদার্থ দিয়ে খেলা, চাল, ডাল দানাদার কিছু দিয়ে খেলা ইত্যাদি। সাধারণত কল্পনাপ্রসূত খেলা খেলতে পারে না। এরা কখনো আত্মপীড়ন করে এবং মনে হয় তাতে সে তেমন কষ্ট পায় না। দুর্গন্ধে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না, স্বাদ ও স্পর্শে তেমন কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশ করে না ইত্যাদি।

ভালো দিকগুলো কি : ১। ভালো স্মরণশক্তি

২। দেখে শেখার অসাধারণ ক্ষমতা

৩। অন্যরা যা দেখে না তাও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা

৪। অটিজমের নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণে সাড়া দেওয়া

৫। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শিতা।

আনুষঙ্গিক সমস্যাবলী : ১। বুদ্ধিমত্তায় ঘাটতি

২। অতি চাঞ্চল্য (Hiper Activity)

৩। জেদী ও আক্রমণাত্মক আচরণ (Aggressiveness)

৪। অহেতুক ভয়ভীতি

৫। ঘুমের সমস্যা

৬। নিজেই নিজেকে আঘাত করা

৭। খিঁচুনি, ইত্যাদি।

প্রাথমিক সতর্কীকরণ চিহ্নসমূহ : বারো মাসের ভিতরে কোনো আধো আধো বুলি (মা...মা...বু...বু...) বলতে না পারা এবং ইশারা ইঙ্গিত করতে না পারা। ষোল মাসের ভিতরে কোনো এক শব্দ না বলা। যেমন— গাড়ি। চব্বিশ মাসের ভিতরেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুই শব্দের বাক্য না বলা। যেমন— ভাত খাব, পানি দাও ইত্যাদি। যে কোনো বয়সেই অর্জিত কোনো ভাষা গত বা সামাজিক দক্ষতা হারিয়ে ফেলা।

দ্রুত শনাক্তকরণের গুরুত্ব : দ্রুত শনাক্তকরণ করে শিশুর সঠিক চিকিৎসা যদি শৈশবেই শুরু করা যায় তবে আচরণের অনেক সমস্যা কঠিন আকার ধারণ করার পূর্বেই সমাধান করা সম্ভব।

অটিস্টিক শিশুদের বিভিন্ন পর্যায় কিকি?

সাধারণত অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের ৪টি পর্যায়ে ভাগ করা হয়। বয়সের সাথে নয় বরং প্রতিটি শিশুর সামর্থ্যের ওপর তার পর্যায় নির্ভর করে।

পর্যায়গুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপ

প্রথম পর্যায় : আত্মকেন্দ্রিক স্তর : এই পর্যায়ে শিশুরা আত্মকেন্দ্রিক থাকে এবং আপন মনে একাকী খেলতে পছন্দ করে। এরা সাধারণত কোনো আদেশ-নিষেধ অথবা নির্দেশ বুঝতে পারে না ও পালন করে না।

দ্বিতীয় পর্যায় : অনুরোধকারী স্তর : এই পর্যায়ের শিশুরা শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে খুব কাছের লোকদের সাথে অল্প সময়ের জন্য যোগাযোগ স্থাপন করে এবং তাদের চাহিদা পূরণ করার জন্য অনুরোধ করে।

তৃতীয় পর্যায় : যোগাযোগ শুরুকারী স্তর : এই পর্যায়ের শিশুরা কিছু প্রচলিত শব্দ বুঝতে পারে এবং অতি পরিচিত মানুষের সাথে অল্প সময়ের জন্য যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। তারা ছোটখাট আদেশ-নির্দেশ পালন করতে পারে।

চতুর্থ পর্যায় : সহযোগী স্তর : এই পর্যায়ের শিশুরা পরিচিত সমবয়সী শিশুদের সাথে অল্প সময়ের জন্য খেলা করে। ভাষায় দক্ষতা একটু ভালো এবং অন্যদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়।

অটিস্টিক শিশুরা কি প্রতিবন্ধী?

অটিস্টিক শিশুরা কখনো কখনো বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শী হয়। এই ধরনের শিশুদের তাই বিশেষ প্রয়োজন সম্পন্ন শিশু বা বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদাসম্পন্ন বলা হয়। যথাযথভাবে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে তারা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারবে বিধায় এদের প্রতিবন্ধী আখ্যায়িত করা সঠিক নয়।

অটিজমের গতিধারা : যদি শিশুর বুদ্ধিমত্তা স্বাভাবিক থাকে, তবে দ্রুত শনাক্তকরণ এবং উপযুক্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে অল্প মাত্রার অটিস্টিক শিশু পড়াশোনাসহ স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারবে। তীব্র মাত্রার অটিজমের ক্ষেত্রে সারা জীবনব্যাপী বিশেষ পরিচর্যার প্রয়োজন।

বাংলাদেশে অটিজম এবং স্নায়ুবিক প্রতিবন্ধিতা নিয়ে যারা কাজ করছেন

1. Centre for Neurodevelopment and Autism in Children (CNAC) BSMMU, Dhaka

2. Dhaka Shishu Hospital

3. Institute of Child and Mother Health (ICMH) : Matuail, Dhaka

4. Centre for the Rehabilitation of the Paralysed (CRP) :Savar

5. Society for Assistance Hearing Impaired Children (SAHIC), Mohakhali, Dhaka

6. Bangladesh JatioProtibondhiUnnoyon Foundation (JPUF), Mirpur 14

7. Medical College Hospital

8. Institute of Child Health & Shishu Swasthya Foundation Hospital,Dhaka:6/2, Borobag, Mirpur, Dhaka-1216. Phone: 8023894-5

শেষ কথা : অটিজম সম্পর্কে জানতে হবে। অটিস্টিক শিশুদের প্রাথমিক পর্যায়েই চিহ্নিত করতে হবে। তাদের দ্রুত যথাযথ স্থানে নিয়ে পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে হবে। অটিস্টিক শিশু ও তাদের বাবা-মায়ের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

লেখক
ডা. ইউ.কে.এম. নাজমুন আরা
এম.বি.বি.এস., এফ.সি.পি.এস. (শিশু); শিশু বিশেষজ্ঞ
জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু)
সাবেক আবাসিক চিকিৎসক (শিশু); ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।