বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস ২০ অক্টোবর। হাড় ক্ষয় বা অস্টিওপোরোসিস নির্ণয়, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা বিষয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ১৯৯৬ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়। এ বছর বাংলাদেশে বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘সকলে বহন করি অস্থির ভার’। দিবসটি উপলক্ষ্যে দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. শাহজাদা সেলিমের লেখা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছে। এরই অংশ হিসেবে শেষ পর্বে প্রকাশিত হলো : ‘হাড় ক্ষয় ও ভঙ্গুরতা চিকিৎসা ও প্রতিকার’।

মানব শরীরে ২০৬টি হাড় আছে। স্বাভাবিক গঠনে হাড়ে আমিষ, কোলাজেন ও ক্যালসিয়াম থাকে বলে হাড় শক্তিশালী হয়। ৩০ বছর বয়সে হাড়ের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে এবং হাড় মজবুত থাকে। একে হাড়ের পিক পরিমাণ বলে। প্রাকৃতিক নিয়মে ৩০ বছরের পর থেকে মানব শরীরে হাড়ের ঘনত্ব ও পরিমাণ কমতে থাকে। হাড় দুর্বল এবং ভঙ্গুর হতে থাকে। ফলে হাড় অতি সহজেই ভেঙে যায়। হাড়ের এই হ্রাসের পরিমাণ নির্ভর করে ব্যক্তির স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস, বংশানুক্রম ও শারীরিক পরিশ্রমের ওপর। হাড়ের এই দুর্বল অবস্থা ৫০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে ওসটিওপোরোসিস বলে। ওসটিওপোরোসিস রোগীর যে কোনো হাড় সামান্য আঘাতেই ভেঙে যায়। তবে মেরুদণ্ডের হাড়, হিপ জয়ন্ট হাড়, পাঁজরের হাড় এবং কবজির (রিস্ট জয়েন্টে) হাড় বেশি আক্রান্ত হয়। হাড় ভাঙার আগ পর্যন্ত রোগী সাধারণত কোনো অসুবিধার কথা বলে না। আবার কিছু কিছু হাড় ভাঙার দীর্ঘদিন পর অসুবিধার সৃষ্টি করে। প্রধান অসুবিধা হলো ব্যথা এবং সটো নির্ভর করে কোন জায়গার হাড় ভঙেছে তার ওপর।

হাড়ের পরিমাণ কমে যাওয়া ও ভঙ্গুরতার প্রবণতা কাদের বেশি?

* ৪০ ভাগ ব্যক্তির হাড়ের পরিমাণ বা ঘনত্ব বংশানুক্রমিকভাবে নির্ধারিত হয়।

* ২০ ভাগ ব্যক্তির হাড়ের পরিমাণ বা ঘনত্ব নির্ধারিত হয় জীবন ব্যবস্থার মাধ্যমে।

* পুরুষের তুলনায় মহিলারা বেশি ভোগে, বিশেষ করে যারা শারীরিক গঠনে পাতলা ও খাটো এবং বয়স্ক।

* প্রতি দু’জন মহিলার মধ্যে একজন ‘ওসটিওপোরোসিস’ রোগে ভোগে।

* প্রায় ২০ ভাগ মহিলা (ঋতুস্রাব বন্ধের পর) মেরুদণ্ডের হাড় ভাঙায় ভোগে এবং পরবর্তী বছরে সাধারণত আরেকটি নতুন হাড় ভাঙে।

* হিপ জয়েন্ট ভাঙা রোগীর ২০ ভাগ পরবর্তী বছর মারা যায়।

* মাত্র এক-তৃতীয়াংশ রোগী সুস্থ হয়ে প্রায় স্বাভাবিক অবস্থায় যেতে পারে।

* এশিয়া মহাদেশের মহিলারা এবং তাদের পরিবারের অন্যরা এই রোগে ভুগছে।

* তাড়াতাড়ি বা অপারেশনের মাধ্যমে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়েছে যে মহিলাদের।

* ধূমপায়ী ও মদ্যপায়ী।

* ক্যালসিয়াযুক্ত খাবার কম খাওয়া।

* শারীরিক পরিশ্রম কম করা।

* এন্ডোক্রাইন (গ্রন্থি) সমস্যা : পিটুইটারি, থাইরয়েড, এডরেনাল ও গোনাড।

* স্টরেয়েপ ও এন্টিকনভ্যালসেন্ট ড্রাগ সেবনকারী।

* রিউমাটয়েড আর্থাইটিস রোগী।

* যক্ষা রোগী।

* খাদ্যনালীর অপারেশন।

* খাদ্যনালীর রোগ— সিলিয়াক ডিজিজ।

* লিভারের (যকৃত) সমস্যা।

উপসর্গ

* প্রথমে পিঠে, কোমরে, ঘাড়ে ও পেশিতে অল্প ব্যথা হয়। পরে হঠাৎ করে তীক্ষ্ণ ব্যথা হয়।

* এ ধরনের ব্যথা এক সপ্তাহ থেকে তিন মাস পর্যন্ত বিদ্যমান হতে পারে।

* অনেক ‘ওসটিওপোরোসিস’ রোগী হাড় ভাঙা না পর্যন্ত বুঝতে পারে না যে সে হাড়ের ক্ষয়, দুর্বল ও ভঙ্গুরতা রোগে ভুগছে।

* মেরুদণ্ডের কশেরুকার উচ্চতা কমে যায়, রোগী সামনে ঝুঁকে থাকে এবং পেছনে কুঁজো হয়। একে স্টুপেড আকৃতি বলে।

* কশেরুকা ভাঙার ব্যথা মেরুদণ্ড থেকে শুরু হয়ে পিঠের দু’পাশ দিয়ে সামনের দিকে আসে এবং বুক ও পেটে অনুভূত হয়।

* সাধারণত পড়ে গিয়ে হালকা আঘাতেই কটি ও কবজির হাড় ভেঙে যায়।

ল্যাবরেটরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা

* সিরাম ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন-ডি এবং টস্টেটোস্টরেন, এন্ড্রোজন, ওসট্রোজেন ও থাইরয়েড হরমোন।

* কিডনি ফাংশন (ব্লাড ইউরিয়া, সিরাম ক্রিয়েটিনিন)।

* এক্স-রে

* স্পেশাল টেস্ট : বোন মিনারেল ডেনসিটি, ডুয়াল এনার্জি এক্স-রে ও সিঙ্গেল এনার্জি এক্স-রে এবোজরসিওমেট্রি।

হাড় মজবুত রাখার উপায়

* উপযুক্ত ব্যায়াম— যেমন নিয়মিত হাঁটা, জগিং, সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা করা এবং ওজন বহন করা।

* কিশোর বয়সে কায়িক পরিশ্রম করলে হাড়ের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং হাড় মোটা হয়। ফলে বৃদ্ধ বয়সে হাড় ক্ষয় কম হয়।

* সুষম খাদ্য এবং কিশোর বয়সে ১৩০০ মিলিগ্রাম, ৫০ বছর পর্যন্ত ১০০০ মিলিগ্রাম এবং ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে ১২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম দৈনিক সেবন করা উচিত।

* ধূমপান ও মদ্যপান থেকে বিরত থাকা।

* হাড়ের পরিমাণ হ্রাস, দুর্বল ও ভঙ্গুরতা প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং ওষুধ সেবন।

* পড়ে যাওয়া থেকে সর্তক থাকতে হবে।

চিকিৎসা

চিকিৎসা নির্ভর করে হাড়ের পরিমাণ হ্রাস, হাড়ের দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা ও হাড়ের ভাঙার ওপর। এ জন্য যা করা দরকার তা হলো :

* নিয়মিত ব্যায়াম করা।

দৈনিক পরিমিত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি সেবন করা।

* বিসোফসোফনেট : এলেনড্রোনেট, ইটিড্রোনেট ও রাইসড্রোনেট সেবন।

* হরমোন রিপ্লেসমেন্টে থেরাপি।

* রেলোক্সফিনে ও ক্যালসিটোনিন ইনজেকশন।

* হাড় ভাঙার জন্য কনজারভেটিভ বা সার্জিক্যাল চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

* ব্যথা নিরাময়ের জন্য এনালজেসিক ওষুধ সেবন করতে হবে।

লেখক

ডা. শাহজাদা সেলিম

সহকারী অধ্যাপক

এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ

কমফোর্ট ডক্টর’স চেম্বার

১৬৫-১৬৬, গ্রীন রোড, ঢাকা